বিজ্ঞাপন

‘ওয়ারিশ সূত্রে’ ভুগছে হাদির ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার

‘ওয়ারিশ সূত্রে’ ভুগছে হাদির ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’-ঘিরে আর্থিক স্বচ্ছতা ও উত্তরাধিকার (ওয়ারিশ) সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিয়েছে। এর জেরে সংগঠনটির চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের এবং সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ ৬ জন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। একইসঙ্গে দাপ্তরিক দলিল-দস্তাবেজ যাচাই সাপেক্ষ সেন্টারটি দাবিদারদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা। 

এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে ‘ওয়ারিশ সূত্রে মালিকানা দাবি’র বিষয়টিকে সম্পূর্ণ মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন ওসমান হাদির বোন মাছুমা হাদি। 

সংগঠনটির বর্তমান পরিস্থিতি ও ‘ওয়ারিশ’ সংক্রান্ত জটিলতার প্রকৃত কারণ জানতে শরীফ ওসমান বিন হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকা পোস্ট। তবে এ বিষয়ে তিনি নিজে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পরিবর্তে, তিনি তার বোন মাছুমা হাদির একটি লিখিত বার্তা প্রতিবেদকের কাছে পাঠান। সেখানে মাছুমা হাদি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে উত্তরাধিকার সূত্রে আমার ভাইয়ের সব কিছুর উত্তরাধিকারী একমাত্র আমার মা এবং ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান। এই তিনজনের মধ্যে কে সেন্টারের দাবি করছে?’

ইনকিলাব মঞ্চ পরিচালিত সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ থেকে সম্প্রতি একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন শীর্ষ ৬ জন। তারা হলেন, সংগঠনের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের, সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমা, সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ফাহিম আব্দুল্লাহ, অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রায়হান এবং উপ-নির্বাহী পরিচালক হাবিবুল্লাহ মিসবাহ।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থা ও কর্মকাণ্ডের খোঁজ নিতে রাজধানীর বাংলামোটরে সরেজমিনে যান প্রতিবেদক। বাংলামোটর মোড় থেকে মাত্র এক মিনিটের হাঁটা পথের দূরত্বে, লিংক রোডের খোদেজা খাতুন স্কুল গলির ডোমিনিয়ন রওশন ভিলা ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত এই সেন্টার। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই প্রবেশমুখে নিরাপত্তার জন্য বসানো স্ক্যানার চোখে পড়ে।

ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় দৃষ্টিনন্দন বইয়ের তাক। এ ছাড়া দর্শনার্থীদের নজর কাড়তে দেয়ালজুড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন শিল্পকর্ম, ক্যালিগ্রাফি ও প্রতিবাদধর্মী চিত্রকর্ম। পাশাপাশি কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে জুলাই আন্দোলন ও সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক নান্দনিক পোস্টার এবং আর্টওয়ার্ক প্রদর্শন করা হয়েছে।

ছবি- আব্দুল্লাহ আল জাবের ও ফাতিমা তাসনিম জুমা

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা রাফসান রাকিব ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রতি রোববার আমাদের সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। তবে সপ্তাহের বাকি ছয় দিন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে দায়িত্বশীলরা সবাই আছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই কার্যক্রম চলছে। আমরা যদি দায়িত্ব ছেড়ে দেই, তখন কারা দায়িত্ব নেবেন, সে বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না।’

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত এলাকায় আছি। ঢাকা এসে আমরা ব্রিফ করে বিস্তারিত জানাব। সেন্টারের দায়িত্বে এখনো আমরাই আছি।’

এর আগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ফেসবুকে করা পোস্টে তিনি লিখেন, শহীদ ওসমান হাদি শাহাদাতের পূর্বে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিলেও শেষ করে যেতে পারেননি। যেহেতু এটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় হতে জনতার আমানত হিসেবে পরিচিত ও পরিকল্পনাও এমনই ছিল, তাই আমরা বিগত ছয় মাস শাহাদাত-পরবর্তী উত্থাপিত ওয়ারিশ সংক্রান্ত ইস্যু সমাধানের চেষ্টা করেছি। সমসাময়িক সময়ে আমরা নানাবিধ প্রোডাক্টিভ কাজের পরিকল্পনাও হাতে নেই, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে আপনারা দেখেছেন বিষয়গুলো আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওসমান হাদিকে যে সম্মান দিয়েছেন, সেই সম্মানের স্বার্থে, তার ওয়ারিশদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ও সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ সাপেক্ষে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দাবিকারীদের নিকট হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যে ভীষণ ভালোবাসা ও সম্মান আপনারা আমায় দিয়েছেন তার জন্য আমি আজীবন কৃতজ্ঞ।

জাবের ইনকিলাব মঞ্চেরও সদস্য সচিব এবং হাদি হত্যা মামলার বাদী। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন তিনি, যা পরবর্তীতে (হাদির মৃত্যুর পর) হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ বলেন, মাত্র অল্প কিছুদিন আগে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম শহীদ ওসমান হাদির অসমাপ্ত কালচারাল লড়াই ও বিপ্লবটাকে কন্টিনিউ করার স্বপ্ন দেখে। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরই চেষ্টা করেছি কালচারাল কাজের পরিধি বাড়ানোর জন্য। কিন্তু নানাবিধ অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ দিনে দিনে এই লড়াইটাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকে শহীদ ওসমান হাদি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জনতার আমানত হিসেবে। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাই বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেছি এই সমস্যা সমাধানের। কিন্তু বিষয়গুলো এতটাই স্পর্শকাতর যা আমার জন্য সামনে এগিয়ে চলার পথ বাধাগ্রস্ত করছে।

ইনকিলাব মঞ্চের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আর্থিক হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ বিরোধের সূত্রপাত হয়। বিশেষ করে সেন্টারের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব পরিবারের পক্ষ থেকে চাওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, অনুদান, ব্যয় এবং অন্যান্য হিসাবের স্পষ্ট বিবরণ জানতে চাইলে তা নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়।

ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাও তার পোস্টে ওসমান হাদি মারা যাওয়ার পর কালচারাল সেন্টার নিয়ে ওয়ারিশ সংক্রান্ত ঝামেলা সামনে আসার কথা লিখেছেন। 

এসব বিষয়ে শরীফ ওসমান বিন হাদির বোন মাছুমা হাদি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলাম, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার থেকে কমিটির দায়িত্বশীল কয়েকজন পদত্যাগ করছেন। আমার প্রশ্ন হলো, পদত্যাগ করা কিংবা না করা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। কিন্তু ওয়ারিশ সূত্রে পরিবার কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব বুঝে নিতে চায়, এই মিথ্যাচার করার মানে কী? কোরআনিক এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে উত্তরাধিকার সূত্রে আমার ভাইয়ের সব কিছুর উত্তরাধিকারী একমাত্র আমার মা এবং ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান। এই তিনজনের মধ্যে কে সেন্টারের দাবি করছে?’

তিনি বলেন, আমি যদি পরিবারের প্রশ্নে আসি, মা, বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তান মিলেই পরিবার। এদের মধ্যে কে দাবি করছে সেন্টারের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য? আমার ভাইয়ের শাহাদাতের পর আমি আমার ভাইয়ের লড়াইয়ের মধ্যে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম; নির্বাচন করতে চেয়েছি, আমার ভাইয়ের কবর স্থায়ীকরণ, স্থায়ী নেইম প্লেট স্থাপন করা ও আমার ভাইকে শহীদের তালিকায় গেজেটভুক্ত করতে চেয়েছি। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সবার সহযোগিতা নিয়ে এই কাজগুলো সম্পন্ন করতে চেয়েছিলাম। আমি ওখানে কোনো পদ বা পদবি কিছুই চাইনি, শুধু আমার ভাইয়ের লড়াইয়ের মধ্যে সেন্টারের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে থেকে বাঁচতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওরা কেউ আমার ফোনটা পর্যন্ত রিসিভ করেনি।

তিনি আরও বলেন, ‘কোরবানির সময় সেন্টার থেকে খালিদ সাইফুল্লাহসহ তিনজন আমার কাছে এসেছিল আমাকে সেন্টারে নেওয়ার জন্য। ওরা বলল, আপা যা কিছু হয়েছে সব ভুলে সেন্টারে চলেন। আমি ওদেরকে এতটুকুই বলেছি, আমার ওখানে তো কোনো কাজ নেই, আমি থাকি নলছিটি। যা হারানোর তা তো হারিয়েছি, আমার হারানোর আর কিছুই নাই। আমি যে কাজগুলো করতে চেয়েছিলাম সেগুলো এখন অনেক জটিল হয়ে গেছে, সেগুলো করা এখন আর অত সহজ না। তাই তোমরা তোমাদের মতো কাজ করে যাও, শুধু ওসমান হাদির আদর্শের ওপর থেকো, এর বেশি কিছু আর চাওয়ার নাই। কিন্তু হঠাৎ করেই দেখলাম, পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে সদস্যরা পদত্যাগ করছেন। কেন এই দূরভিসন্ধি? কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে? একজন শহীদের পরিবারকে বিতর্কিত করার মানে কী?’

মাছুমা হাদি বলেন, ‘আমি যতদূর জানি, ওমর হাদি সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই দায়িত্বশীল পদে রয়েছে, সেই হিসেবে ওমরকে সেন্টারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নমিনি করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট অটোমেটিক ফ্রিজ হয়ে যায়। ওমর যেহেতু দেশের বাইরে আছে, ওর সঙ্গে কথা বলে কীভাবে কী করা যায়, সমাধান করে নিলেই পারতো। কেন এই মিথ্যাচার?’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শরীফ ওসমান বিন হাদি। তার হাত ধরেই সংগঠনটির সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। মূলত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানামুখী বই প্রকাশনা ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুতই আলোচনায় আসে কেন্দ্রটি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এর প্রতিষ্ঠাতা শরীফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

এমএসআই/এমএসএ