বিজ্ঞাপন

মানসিক রোগীর ৯২ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে

মানসিক রোগীর ৯২ শতাংশই চিকিৎসার বাইরে

দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চরম সংকটের চিত্র উঠে এসেছে জাতীয় সংসদে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মানসিক রোগে ভুগলেও তাদের ৯২ শতাংশের বেশি কোনো চিকিৎসা সেবা পান না। এমনকি দেশের প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন মাত্র ১.১৭ জন। বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ ও ক্যান্সার মৃত্যুর প্রধান কারণ হলেও মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাসের ক্ষেত্রে মানসিক ব্যাধিই এখন অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তরে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের এই উদ্বেগজনক চিত্র ও সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী অক্ষমতাজনিত রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মানসিক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যা বর্তমানে মানুষের অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। যদিও মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে হৃদরোগ ও ক্যান্সার এখনও শীর্ষে অবস্থান করছে, তবে মানুষের দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানসিক ব্যাধিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯-এর পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংসদে তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৬.৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের প্রায় ১২.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে ৯২ শতাংশেরও বেশি ব্যক্তি কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন না বা সেবার আওতার বাইরে থেকে যান। বাংলাদেশে বর্তমানে জনসংখ্যার তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয়। দেশে প্রতি ১ লাখ জনগণের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন মাত্র ১.১৭ জন। এছাড়া সরকারি খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩৫০ জন, যা বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

এই বিশাল ঘাটতি পূরণে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা বাড়াতে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা সংসদে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালকে দেশের প্রধান বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য খাতের আইনি ও কৌশলগত উন্নয়নে ইতিমধ্যে 'মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮' প্রণয়ন করা হয়েছে এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা (২০২০-২০৩০) বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মানসিক স্বাস্থ্য কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য পৃথক পরিচালক পদ সৃষ্টির একটি প্রস্তাব বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে মানসিক চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম বা এমএইচজিএপ-এর আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, নোয়াখালী, বান্দরবান, সিলেট, শেরপুর, নেত্রকোনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুড়িগ্রাম এই ১০টি জেলায় এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর পাশাপাশি দেশে ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার ঘটনা প্রতিরোধে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের যৌথ সহযোগিতায় দেশের যশোর, ঝিনাইদহ, সিলেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এই ৪টি জেলায় বর্তমানে আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মন্ত্রী সংসদে আরও জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্পেশাল ইনিশিয়েটিভ ফর মেন্টাল হেলথ (এসআইএমএইচ) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ বিশ্বের নির্বাচিত ৯টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বয় করা, যা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ নিশ্চিত করতে বিশেষ টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ সেবা সম্প্রসারণের কাজও সরকার চালিয়ে যাচ্ছে।

এসআর/জেডএস

বিজ্ঞাপন