বিজ্ঞাপন

সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে সংসদে তোলপাড়

বিরোধী দলের ওয়াকআউট, দুই শপথের বিতর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া জবাব

বিরোধী দলের ওয়াকআউট, দুই শপথের বিতর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া জবাব

জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কমিটির গঠন প্রক্রিয়া ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। অপরদিকে, বিরোধী দলের এই অবস্থানকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘আবেগ সর্বস্ব রাজনীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।

সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করার পর বিরোধীদল অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে।

ওয়াকআউট করার আগে সংসদ অধিবেশনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি প্রথম অধিবেশনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উত্থাপন করেছিলেন এবং সেই দিনই বিরোধী দল তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় কয়েক দফায় তাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং বৈঠক করেছেন। তবে বিরোধী দল কখনই এই কমিটির জন্য কোনো সদস্যের নাম দেবে বলে জানায়নি, কারণ তারা কনসেপচুয়ালি বা নীতিগতভাবে এই প্রস্তাবকে এক্সসেপ্ট বা গ্রহণ করেনি।

ড. শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, তারা জনগণের কাছে এবং জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ, যেমনটি বর্তমান সরকারি দলও নির্বাচনের আগে ওয়াদাবদ্ধ ছিল। নির্বাচনের পূর্বে সব দলই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানিয়েছিল এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হবে। এরই প্রেক্ষিতে তারা দুটি শপথ নিয়েছেন, একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। বিরোধী দল মনে করে তাদের দুটি শপথই বহাল ও কার্যকর আছে। সুতরাং, সেই সংস্কার পরিষদকে বাইপাস বা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যদি এই সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, তবে তারা এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছেন।

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, তারা তাদের আগের অবস্থানেই অনড় আছেন এবং গণতন্ত্রের মূল দাবিই হচ্ছে জনগণের মতামতকে মেনে নেওয়া, যা এই ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি অর্থাৎ ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের রায়। এই বিপুল জনমতকে যদি অবলীলায় শেষ করে দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে এবং বিদ্রোহী হয়ে উঠবে।

জনগণের এই অভিপ্রায় ও মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য বা অপমান করা উচিত হবে না উল্লেখ করে ড. শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন যে, জনগণের রায়কে সম্মান না জানানোর প্রতিবাদে তারা শুধু এই কমিটিতে অংশগ্রহণ থেকেই বিরত থাকবেন না, বরং সংসদ থেকে ওয়াকআউট করবেন। এই বক্তব্য শেষ করেই তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে এর কড়া জবাব দেন। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা যে পয়েন্টে ওয়াকআউট করছেন তা তাদের বিবেচনায় সঠিক হতে পারে, তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের মূল প্রত্যাশা হলো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা। এই লেজিসলেচারে যদি পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা না হয়, তবে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও দেশকে ওই বিতর্কিত সংশোধনীর ওপর ভিত্তি করেই চলতে হবে। সুতরাং, সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা এবং সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া এই জাতিকে নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

বিরোধীদলীয় নেতার দুটি শপথের দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুটি শপথ নিলে প্রথম শপথটিই তো অবৈধ হয়ে যায়। কারণ বর্তমান সংবিধান অনুসারেই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং সেই সংবিধান অনুযায়ীই সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সরকারি ও বিরোধী উভয় দল আলোচনা করেছে। সাংবিধানিক নিয়ম ও ধারাবাহিকতা অনুসারেই সংসদের প্রত্যেকটি অধিবেশন ও বৈঠক পরিচালিত হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, সংবিধানে কোথায় আছে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেওয়া যাবে? তিনি একে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তে আইনি উপদেষ্টার নথিতে পাস করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল যা প্রথম দিন থেকেই অবৈধ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮ এবং তৃতীয় তফসিল লঙ্ঘন করে ব্লু পেপারে সংসদ সদস্যদের জন্য আরেকটি শপথের যে ফর্ম ছাপানো হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ বা বাতিল এবং এর কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণভোটের যে আদেশ, যেটিকে ‘জুলাই আদেশ’ বা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ নাম দেওয়া হয়েছে, সেটি প্রথম দিন থেকেই এখতিয়ার বহির্ভূত, ফ্রড অন কনস্টিটিউশন এবং কালারেবল লেজিসলেশন ছিল, যা রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। রাজনৈতিক সমঝোতার জুলাই সনদের কোথাও এমন কিছু ছিল না যেখানে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করেছে।

তিনি আরও বলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫ অনুযায়ী একক ও স্বাধীন রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের পূর্ণ এখতিয়ার ও সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণকে অনুচ্ছেদ ৭ অনুসারে সংসদ সদস্যদের দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন যে, জুলাই জাতীয় সনদে যে সমঝোতা হয়েছে তার চার ভাগের সাড়ে তিন ভাগ তারা মানেন, কিন্তু বাকি আধা খানি অংশ সংবিধানের ওপর অবৈধ হাত বাড়িয়েছে। বিরোধী দলকে সংসদে এসে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় রাস্তায় গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কমিটি করলে সংবিধান সংশোধন না করে তারা বসে থাকতে পারবেন না। আর সংবিধান সংশোধন না করলে জাতিকে শেখ হাসিনার দেওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই চলতে হবে, যা কেউ চায় না।

অবিলম্বে এই সংবিধান সংশোধনী কমিটি কাজ শুরু করবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জুডিশিয়ারি, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলের সাথে সংসদ ও সংসদের বাইরে বিস্তারিত আলোচনা ও বৈঠক করবেন। এরপর সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সুপারিশের ভিত্তিতে এই মহান জাতীয় সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, বিরোধীদলীয় সদস্যগণ ইমোশনাল বা আবেগ সর্বস্ব রাজনীতি পরিহার করে একটি শক্তিশালী সংবিধান সংশোধনী বিল আনার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।

এসআর/এমএন