চীন সফর সংক্ষিপ্ত করে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই রাতে দেশে ফেরেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তাল। ৩ দিন পর ১৪ জুলাই প্রকাশ পায় সরকারি চাকরিতে কোটা বহালের পক্ষে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়। সেদিন বিকেলে গণভবনে আয়োজন করা হয়েছিল শেখ হাসিনার চীন সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন।
সেখানে এটিএন নিউজের সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের পরোক্ষভাবে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলেন। তার এই মন্তব্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বারুদ জ্বলে ওঠে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া অহিংস আন্দোলন রূপ নেয় এক সর্বাত্মক গণ-আন্দোলনে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। সেদিন শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয় এবং স্বৈরাচার শেখ হাসিনা পালিয়ে যান পাশের দেশ ভারতে।
এটিএন নিউজের সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের প্রশ্নের জবাবে কী বলেছিলেন শেখা হাসিনা? তিনি বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-পুতিরা কেউ মেধাবী না, যত রাজাকারের বাচ্চারা, নাতি-পুতিরা হলো মেধাবী, তাই না?... মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা (সরকারি চাকরি) পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’
শিক্ষার্থীদের প্রতি অবমাননাকর এই বক্তব্য প্রচারের পর প্রথমে সমালোচনা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মাঝরাতে হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হল থেকে বের হয়ে আসেন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ও সুফিয়া কামাল হলের মেয়েরা মিছিল নিয়ে সবার আগে বের হয়ে আসেন। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সেদিন শিক্ষার্থীদের মুখে শোনা যায়, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার-রাজাকার’, ‘কে বলেছে কে বলেছে, সরকার-সরকার’, ‘রাজাকার আসছে, রাজপথ কাঁপছে’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ ইত্যাদি স্লোগান।

আন্দোলনের পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা নতুন করে আন্দোলনে নামেন এবং কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশ জারির দাবি জানান। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটি ছিল।
পরে ১ জুলাই থেকে আন্দোলন পরোদমে শুরু হয়। সেদিন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে নতুন প্লাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই ব্যানারে গণপদযাত্রা, সড়ক অবরোধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সমাবেশ, বিক্ষোভ ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি পালন করেন।
আন্দোলনের শুরুটা ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মসূচি বিস্তৃত হতে থাকে। ১ জুলাই থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান, মিছিল ও রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচিও ঘোষণা করেন আন্দোলনের সমন্বয়করা।
চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলন নিয়ে শেখ হাসিনার করা মন্তব্যকে আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখছেন আন্দোলনের নেতারা ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ওই বক্তব্যের পর আন্দোলন নতুন গতি পায়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ৪ জুলাইয়ের মধ্যে দাবি আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি। এরপর আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। কিন্তু আপিল বিভাগের শুনানিতে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর নিয়মিত আপিল করার পরামর্শ দেয় আপিল বিভাগ।
৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আনুষ্ঠানিক নৈতিক সমর্থন জানায় জামায়াত ও বিএনপি। ৭ জুলাই ঘোষিত কর্মসূচি ‘বাংলা ব্লকেডে’ সাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীরা মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬৫ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ন্যূনতম কোটা রেখে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে ‘অযৌক্তিক’ কোটা বাতিলের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। ৯ জুলাই সারা দেশে আবারও সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলে পক্ষভুক্ত হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আবেদন করেন। ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের ওপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা ঘোষণা করেন।
৭ জুলাই পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এরপর ওই দিনই সড়ক-মহাসড়কের সঙ্গে রেলপথও শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেলযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১১ জুলাই শাহবাগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতি হয়, ব্যারিকেড ভেঙে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শিক্ষার্থীদের অনেকে আহত হয়। সেদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শিক্ষার্থীরা ‘লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘রাস্তায় চেঁচিয়ে আদালতের রায় পাল্টানো যায় না... জনগণের চলাফেরার নিরাপত্তা এবং কাজ করার পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের। এগুলো যদি হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সরকারকে নিশ্চয়ই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
১২ জুলাই পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ। ১১ জুলাই শাহবাগে হাতাহাতির ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করে পুলিশ বাদী মামলা হয়। ১৩ জুলাই মিথ্যা মামলা দিয়ে আন্দোলনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই দিন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ মন্তব্য করেন- ‘কোটার সমাধান আদালতের মাধ্যমেই হতে হবে।’
তারপর এল বিতর্কিত মন্তব্যের সেই ‘১৪ জুলাই’
কোটা সংস্কার আন্দোলনের এমন পরিস্থিতিতে মধ্যে চীন সফর নিয়ে শেখ হাসিনা ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক প্রভাষ আমিন প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, ‘মনে হতে পারে যে, যারা কোটায় চাকরি করে তাদের মেধা নেই। কিন্তু আবেদন করার ক্ষেত্রে কোটা লাগে না। প্রিলিমিনারিতে কোটা লাগে না, লিখিততে কোটা লাগে না। একদম শেষ মুহূর্তে গিয়ে কোটা এপ্লাই হয়। তখন আসলে মেধায় সবাই সমান। এখন আমার সামনে যদি দুইটা অপশন থাকে যে, দুজনেই সমান মেধাবী। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আর একজন রাজাকারের সন্তান। আমি অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে বেছে নেবো। ফলে মেধা ও কোটা খুব সহজেই মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাচ্ছে যে, সব মেধাবীরা চাকরি না পেয়ে, কোটায় চাকরি হচ্ছে।’
এ সময় তিনি শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, গত ১০-১২ দিন ধরে আন্দোলন হচ্ছে। আপনারা অসীম ধৈর্যের সাঙ্গে আন্দোলন মোকাবিলা করছেন। যারা আন্দোলন করছেন, তারা সংক্ষুব্ধ, চাকরি না পেয়ে বঞ্চিত। তাদের ক্ষোভের সঙ্গে আমি খুবই একমত। তাদেরকে পিছনে অন্য কেউ ইন্ধন জুগিয়ে, ভুল বুঝিয়ে, বিভ্রান্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে কিনা?
প্রশ্নের পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, আপনারা যে ধৈর্য দেখিয়ে যাচ্ছেন, সেটা দেখিয়ে তাদের সঙ্গে কোনোভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে.... কারণ আগামী ৭ই আগস্ট পর্যন্ত কিছু করার নাই। কারণ সেদিন আপিল বিভাগে শুনানি হবে। তারপর আপিল বিভাগের রায়ের পরে হয়তো নির্বাহী বিভাগের ব্যাপার, কী করবে না করবে। ততদিন অন্ততঃ তারা যাতে বুঝতে পারে। সেটা আপনি (শেখ হাসিনা) অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে যদি বিষয়টি বিবেচনা করেন, তাহলে ভালো হয়...
প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেখানে অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রাধিকার পাবে। এটা তো দিতেই হবে। কোটা আর মেধা তো এক জিনিস না। এখানে দ্বন্দ্বটা সৃষ্টি করা এটা একটা ট্যাকটিক্স (কৌশল)। তার মানে কি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নাতিপুতিরা কেউ মেধাবী না? যত রাজাকারের বাচ্চা, নাতিপুতিরা হলো মেধাবী? তাই না? কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে যাদেরকে মেধাবী না বলছে তাদের হাতে কিন্তু ওরা পরাজিত। যুদ্ধে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারাই জয়ী হয়েছিল। রাজাকাররা জয়ী হয় নাই।”
হাসিনা সেদিন আরও বলেন, আমি দেখলাম, মুক্তিযোদ্ধার এক নাতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে কোটাতে। সেও বলে, কোটা থাকবে না। তো ব্যাটা, তুই তাহলে চলে আয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তোর ভর্তি হতে হবে না। তোকে ইউনিভার্সিটি থেকে বের করে দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, যারা আন্দোলন করছে, তারা আইন মানবে না, আদালত মানবে না। সংবিধান কী, তা তারা চেনে না। একটা সরকার কীভাবে চলে, সে সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান নেই। ভবিষ্যতে এরা তো দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাদের জানা উচিত, আমাদের সংবিধান কী বলে, রাষ্ট্র পরিচালিত হয় কীভাবে? সেটা তাদের জানা উচিত। এটা (কোটার বিষয়) যখন আদালতে চলে গেল, সেটা সমাধান করবে আদালত। আদালত তাদের সুযোগ দিয়েছে। তারা আদালতে যাক, আর্গুমেন্ট করুক।
১৪ জুলাইয়ের পর আন্দোলনকারীদের মুখে উচ্চারিত ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার-রাজাকার’ ‘কে বলেছে, কে বলেছে? সরকার সরকার’ এবং ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’–এমন স্লোগান আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষোভে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে নেমে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ায়। সে রাতে ঘড়ির কাঁটা নয়টা পার হতে না হতেই বিভিন্ন হল থেকে ভেসে আসতে থাকে স্লোগান।
শিক্ষার্থীরা সমস্বরে স্লোগান তোলেন, ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার রাজাকার’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে? সরকার সরকার’। চোখের নিমিষে শিক্ষার্থীদের স্লোগানমুখর বিক্ষোভ মিছিল সড়কে নেমে আসে। সে রাতে শুধু ছেলেরা নয়, হলের ‘সান্ধ্যআইনকে’ তোয়াক্কা না করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে রোকেয়া হল ও সুফিয়া কামাল হল থেকে সড়কে নেমে আসে মেয়েরাও। ধীরে ধীরে অন্যান্য হল থেকেও দলে দলে শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়।
সবার মুখে তখন একটাই কথা। রাজাকার বলে শেখ হাসিনা তাদের অপমান করেছেন। তাদের প্রশ্ন, কোটা সংস্কার চাওয়া সবাই কি রাজাকারের বংশধর? এমন প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ছেয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান তোলেন, ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার।’
সে রাতেই প্রথম আন্দোলনে অনেক বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে ভিসি চত্বর পর্যন্ত লোকে-লোকারণ্য হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ মাইক, কেউ লাঠি, কেউ ঝাড়ু হাতে আসেন। কেউবা আবার স্টিলের থালা বাজিয়ে বাকিদের উদ্বুদ্ধ করেন।
একই দিন কোটা আন্দোলনকে ‘সরকারবিরোধী রূপ দেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বিএনপি’, এমন অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সেদিনের বিক্ষোভের খবরে শাহবাগ মোড়ে সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ। কাউকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। এমনকি ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরাও শাহবাগ মোড় পেরিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারছিল না। টিএসসি থেকে ভিসি চত্বর পর্যন্ত যখন আন্দোলনকারীদের দখলে, ঠিক সে সময় মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের একদল কর্মী জড়ো হয়। দূর থেকে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েকবার স্লোগান চালাচালি হলেও সে রাতে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। তবে পরদিন পুলিশের সহযোগিতায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। নির্বিচারে মারধর-লাঠিপেটায় সেদিন ছাত্রীসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। ক্যাম্পাসে রক্তের দাগ ফেলে ছাত্রলীগ।
এদিকে ১৮ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কারের দাবিতে গণপদযাত্রা শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন আন্দোলনকারীরা। পথিমধ্যে বহু জায়গায় তাদের আটকানো হয়, ব্যারিকেড দেওয়া হয়। তবে সেসব উপেক্ষা করেই এগিয়ে যান তারা। শেষ পর্যন্ত ১২ জনের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি দিয়ে আসেন।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে জনদুর্ভোগ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পাচ্ছি না। সরকারের কী উদ্দেশ্য, সেটা আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না’।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৪ জুলাইয়ের মন্তব্য শিক্ষার্থীদের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত করে এবং আন্দোলনকে সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শেখ হাসিনার মন্তব্য ছিল টার্নিং পয়েন্ট : বাকের মজুমদার
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত কোটা সংস্কার ও সরকার পতনের আন্দোলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ সমন্বয়ক ছিলেন আবু বাকের মজুমদার। তিনি স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট বলে মন্তব্য করেন।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলন থেকে শেখ হাসিনার ‘...মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও (সরকারি চাকরি) পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’ বক্তব্য ছিল টার্নিং পয়েন্ট। তার ওই বক্তব্য বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দিতে নতুন মোমেন্টাম হিসেবে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, ১৪ জুলাই আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। ওইদিন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য আন্দোলনকারীরা ছাড়াও সব শিক্ষার্থীর আত্মমর্যাদায় আঘাত করে। কারণ শেখ হাসিনা ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে নিজস্ব রাজনৈতিক বাইনারি তৈরি করেছিল যে, আওয়ামী লীগ মাত্রই মুক্তিযুদ্ধের শক্তি, আওয়ামী লীগ না করলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। তার বক্তব্যের পর আত্মমর্যাদার লড়াই হিসেবে অনেকে আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে স্যাটায়ার করে। রাতে আন্দোলনকারীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে মাঠে নেমে পড়ে। মেয়েরা হল থেকে মধ্যরাতে মিছিল নিয়ে বের হয়।
আবু বাকের মজুমদার বলেন, সেদিন যুগান্তকারী স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। শিক্ষার্থীরা সমস্বরে স্লোগান তোলেন, ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার রাজাকার’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে? সরকার সরকার’। এরপর মূলত- আন্দোলন ধীরে ধীরে গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে গুলি করে শিক্ষার্থী হত্যা শুরু হলে সরকার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
জেইউ/বিআরইউ
