বিজ্ঞাপন

প্রবাসীদের হয়রানির জটলা কাটাতে সরকারের যৌথ উদ্যোগ

প্রবাসীদের হয়রানির জটলা কাটাতে সরকারের যৌথ উদ্যোগ

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা লাখো প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা পাসপোর্ট নবায়ন এবং দেশের প্রবেশদ্বার বিমানবন্দরে পা রাখতেই প্রতিনিয়ত নানা প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে পাসপোর্ট পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, দালালদের দৌরাত্ম্য, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের দাবি এবং দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি ও কাস্টমসের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানিতে প্রবাসীদের জীবন ও কর্মসংস্থান আজ মারাত্মক ঝুঁকিতে।

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রবাসীদের এই চরম ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।

এর জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সংসদকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র এবং বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও বিমানবন্দর সংক্রান্ত সব হয়রানি দূর করতে এবং সেবার মান বাড়াতে একটি উচ্চপর্যায়ের 'আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি' গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জনগুরুত্বসম্পন্ন সংক্রান্ত নোটিশ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর নজরে আনেন। পরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন ও বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধে আশ্বস্ত করেন।

দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে রুমিন ফারহানা বলেন, বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক অভিবাসন উৎসদেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে দেশের বাইরে কর্মরত আছেন। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধ পথে রেকর্ড ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আমাদের মোট আমদানি কিংবা তৈরি পোশাকসহ প্রধান প্রধান রপ্তানি খাত থেকেও অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্স অর্জনকারী দেশ হলেও এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক কষ্টের গল্প।

সংসদ সদস্য সামাজিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ বাংলাদেশে এসেছে। এছাড়া ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের লাশ দেশে ফেরত এসেছে, যাদের বড় অংশের বয়সই ছিল ৪০ বছরের নিচে। কোনো পূর্ববর্তী জটিল রোগ বা কোমরবিডিটি ছাড়াই শুধু বৈরী পরিবেশ, অতিরিক্ত পরিশ্রম, পরিবার থেকে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা, মানসিক দুশ্চিন্তা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণে তারা অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কারণে তৈরি হওয়া পারিবারিক দূরত্ব, সন্তানদের বাবাকে চিনতে না পারা এবং কষ্টার্জিত অর্থে দেশে কেনা সম্পত্তিতে প্রবাসীর নিজের নাম না থাকার মতো দুঃখজনক সামাজিক বাস্তবতার কথাও তিনি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে পাসপোর্ট নবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা, দালালদের দৌরাত্ম্য, বিমানবন্দরে হয়রানি, লাগেজ চুরি এবং অতিরিক্ত মেডিকেল ফির মতো হয়রানির তীব্র সমালোচনা করেন।

রুমিন ফারহানার এই প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী জনাব আরিফুল হক চৌধুরী প্রথমেই সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেন, পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন, বিমানবন্দরে হয়রানি ও লাগেজ চুরির বিষয়টি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এবং ভিসা নবায়নের বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত। মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করার অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি স্পষ্ট করেন যে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সব বিভাগের সাথে সমন্বয় করে প্রবাসীদের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

বিদেশে মৃত্যুবরণকারী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের গৃহীত নানা কল্যাণমুখী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী জানান, বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্রধারী কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে দ্রুততম সময়ে মরদেহ দেশে আনা এবং বিমানবন্দরে স্বজনদের কাছে তা বুঝিয়ে দেওয়ার সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে লাশ পরিবহন ও দাফনের খরচ হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে ৩৫ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ হাজার ৩১২ জন প্রবাসীর পরিবারকে এই বাবদ মোট ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।

এ ছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে মৃতদেহ ও অসুস্থ রোগীদের বিনামূল্যে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। নিবন্ধিত প্রবাসীদের মৃত্যুর দুই মাসের মধ্যে তাদের পরিবারকে ৩ লাখ টাকা এবং গুরুতর অসুস্থদের চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ১৮১টি মেডিকেল সেন্টারের ওপর নিয়মিত তদারকি বজায় রাখা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ফি আদায়ের যেকোনো অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এরপর সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা দেশের বিশাল বেকারত্ব ঘোচাতে এবং অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জানতে চান, ভারত বা পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়ার অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কীভাবে কমানো সম্ভব এবং সাধারণ মানুষকে বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে মন্ত্রণালয় কী ভূমিকা রাখছে।

এই প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সমুদ্রপথ বা যেকোনো অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কঠোরভাবে রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। কম খরচে ও সহজে দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জাতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। অভিবাসন ব্যয় হ্রাস ও প্রবাসীদের সার্বিক সেবা আরও সহজ করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে, যার মাধ্যমে নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রবাসীদের পাসপোর্ট, ভিসা ও মেডিকেল সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমন্বিতভাবে সমাধান করতে খুব শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে মন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

এসআর/বিআরইউ