জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্র সংস্কার কোনো একক রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়। বরং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এটি সব রাজনৈতিক শক্তির নৈতিক দায়িত্ব। একইসঙ্গে তারা পুরোনো সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি গড়েতিুলতে হবে। তা না হলে গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সুফল দেশের জনগণ কখনোই পাবে না।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি: সংকট, সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষকআলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেএসডি সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।
আলোচনা সভায় রাজনৈতিক চিন্তক ও গবেষক ডা. হেলালুজ্জাম আহমেদ বলেন, গণআকাঙ্খাকে সামনে রেখে রাষ্ট্র সংস্কারের দিকেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। নয়তো এই অভ্যুত্থানের সুফল এই দেশের জনগণ কখনোই পাবে না।
এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, প্রাগৈতিহাসিকভাবেই লাদেশের জনগণ বিভিন্ন সময় রাজনীতিবিদদের কারণে বারবারই প্রতারিত হয়েছে। সেটি ৪৭ এর দেশ ভাগ, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেরপর, ৯০ এর গণ অভ্যুত্থান, সবশেষ ২৪ এর জুলাই গণ অভ্যুত্থান। তবে এবার এটি ঘটতো না যদি ৫ আগস্ট এই গণ অভ্যুত্থানকে বিপ্লব হিসেবে ঘোষণা করে সম্পূর্ন নতুন একটি সংবিধান লেখার কাজ হাতে নেয়া হতো। পুরোনো সংবিধান বহাল থাকাতে রাষ্ট্রের আগের চরিত্র রয়ে গেছে।
এডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো বারবারই জাতির সাথে প্রতারণা করেছে। জনগণকে এসব প্রতারণা থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি নিয়ে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো লড়াই চলমান রেখেছে তাদের নিয়ে নতুন ধারার রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে।
গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেত্রী সামান্তা শারমিন বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের নীতি নৈতিকতার পরিবর্তন না হলে কোন সংস্কারই কাজে
আসবে না। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।
জেএসডি সিনিয়র সহ-সভাপতি মিসেস তানিয়া রব বলেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি করেছিলো সেটি দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ রাষ্ট্র সংস্কার কোন একক দলের বাস্তবায়িত করার বিষয় নয়, বরং এটি গণ অভ্যুত্থানের আকাঙ্খা বাস্তবায়নে সকলে নৈতিক কর্তব্য।
মূল প্রবন্ধে জেএসডি সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্ন নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো, অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা এবং দলকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একটি অধিকতর গণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। সিরাজুল আলম খানের প্রস্তাবিত চৌদ্দ দফার ভিত্তিতে জেএসড‘র ১০ দফা সেই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ, সুসংহত ও দূরদর্শী রাষ্ট্রসংস্কার-রূপরেখা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর মৌলিক দর্শনকে নিম্নোক্ত রাষ্ট্রসংস্কার অগ্রাধিকারসমূহে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যায়—
প্রথমত, রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ; প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রদেশ গঠন; শক্তিশালী, স্বশাসিত স্থানীয় সরকার (উপজেলা ও মেট্রোপলিটন সরকার) প্রতিষ্ঠা; এবং তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকরভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর।
দ্বিতীয়ত, সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোর পুনর্গঠন; ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা; অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন রোধ; সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন; বিচার বিভাগসহ সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ; এবং একটি সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা।
তৃতীয়ত, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের পরিসর সম্প্রসারণ; রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শক্তির প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ; দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা; এবং উচ্চকক্ষে পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক, নারী, প্রবাসী, যুবসমাজ, উদ্যোক্তা ও অন্যান্য সামাজিক শক্তির প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক ব্যবস্থা করা।
চতুর্থত, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রশ্নে গণভোটের বিধান প্রবর্তন; জাতীয় ঐকমত্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
পঞ্চমত, ন্যায়ভিত্তিক, উৎপাদনমুখী ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা; জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ গঠন; অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, প্রযুক্তিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; পাশাপাশি বৈষম্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা।
ষষ্ঠত, মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়নকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থান দেওয়া; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়কে জাতীয় উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
সপ্তমত, অংশীদারিত্ব ও জবাবদিহিমূলক এবং নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; জাতীয় ঐকমত্য, আইনের শাসন, সুশাসন, দুর্নীতিদমন, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করা।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন জেএসডি'র সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সিরাজ মিয়া,মহানগর সমন্বয়ক নুরুল আকতার।সঞ্চালনা করেন সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সামছুল আলম নিক্সন,সহ দপ্তর সম্পাদক ফারহান হাবীব।
এমএসআই/এমএসএ
