সকাল সাড়ে নয়টা। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কালীপুর ইউনিয়নের ধূপীপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হারাধন ধূপী (৬২)। পরনে একটি লুঙ্গি আর শার্ট, যা কাদা ও বালিতে ধূসর হয়ে গেছে। তার চোখে মুখে এক রাশ শূন্যতা। তার সামনে আছে ভিটেমাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক জরাজীর্ণ কঙ্কালসার কাঠামো, এটিই ছিল তার বসতঘর। গত কয়েক দিনের ভয়াবহ বন্যায় এটি এখন ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে হারাধন ধূপী বলেন, চাল-ডাল দিয়ে কী করব? এই যে মাথার ওপরের ছাদটা চলে গেল, এটাই তো প্রধান বিপদ। ত্রাণ দিয়ে তো আর ঘর ফেরত পাওয়া যায় না। সরকার যদি একটি ঘর দেওয়ার ব্যবস্থা করত, তাহলে অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই হতো।
হারাধনের মতো একই হাহাকার এখন পুরো বাঁশখালী জুড়ে। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার গুনাগরি, বাহারছড়া, খানখানাবাদ, বৈলছড়িসহ উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর চিত্র নিমেষেই বদলে গেছে। স্রোতের তোড়ে ভেঙে পড়েছে বসতবাড়ি, ভেসে গেছে গৃহপালিত হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু। কৃষিজমি পরিণত হয়েছে বালুর চরে। হাজারো মানুষের এখন একটাই দাবি-ত্রাণ নয়, আমাদের একটি ঘর চাই।
ধ্বংসস্তূপের সাক্ষী বাঁশখালীর জনপদ
বাঁশখালীর ৩ নম্বর খানখানাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডটি এখন যেন ধ্বংসস্তূপের এক জীবন্ত চিত্র। ভয়াবহ বন্যায় এই গ্রামের চেহারা নিমেষেই বদলে গেছে। কেবল খানখানাবাদ নয়, পুরো বাঁশখালীর গুনাগরি, বাহারছড়া, বৈলছড়িসহ উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর চিত্র একই।

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামগুলোর কাঁচা রাস্তাঘাট এখনো কাদা কাদা হয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তা ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। বাড়ির চারপাশে জমে আছে বন্যার বিষাক্ত পানি। ড্রেন ও ডোবা নালার পচা পানি মিশে একাকার হয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘরহীন জীবন। পরিবারগুলো এখন তাদের ভিটেমাটির ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে রাত কাটাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা যেন মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
এদিকে, বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি, ফুটে ওঠা ক্ষতচিহ্ন ও মানুষের আর্তনাদ যখন প্রকট হয়ে উঠছে, তখন বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুর ১টার দিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৩ নম্বর খানখানাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বঢেমরা জলকদরের খাল খনন কার্যক্রম পরিদর্শনে আসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
বন্যার্ত মানুষের দুর্দশা ও সরকারি সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দুর্গত মানুষের সহায়তায় কোনো রাজনীতি নেই। ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু আরও বলেন, ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ সভা করা হয়েছে। মৎস্য খাত, ঘরবাড়ি ও কৃষির কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার একটি দ্রুত মূল্যায়ন তৈরি করতে বলা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্যার শুরু থেকেই সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা চলছে। শুকনো খাবার, চাল-ডাল এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মূল দাবি এখন আর খাদ্য নয়, বরং আশ্রয়।
শামসুল আলম নামের এক স্কুলশিক্ষক বলেন, আমাদের এলাকার মানুষ স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে। বন্যায় তারা সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। ত্রাণ দিয়ে কয়েকদিন হয়তো পেট চলবে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসন ছাড়া তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। একটা পরিবারের জন্য ঘর হলো নিরাপত্তার প্রতীক। ঘর নেই যার, তার নিরাপত্তা নেই। তাই ত্রাণ নয়, এখন সময়ের দাবি হচ্ছে গৃহহীনদের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করা।
পূর্বঢেমরা গ্রামের দিনমজুর হোসেন মিয়া (৪৫) নিজের জমানো টাকা দিয়ে ঘর তুলেছিলেন বছরখানেক আগে। এখন সেই ঘরের খুঁটিগুলো কাত হয়ে আছে। টিনের চাল উড়ে গেছে বন্যার তোড়ে। তার চার সন্তান নিয়ে এখন তিনি পাশের একটি উঁচু রাস্তায় ত্রিপল টাঙিয়ে থাকছেন।
কণ্ঠে হতাশা নিয়ে হোসেন মিয়া বলেন, দশ বছর কষ্ট করে টাকা জমিয়েছিলাম। এখন সব শেষ। সরকার যদি একটি ঘর বানিয়ে না দেয়, এই জীবনে আমি আর কোনোদিন নিজের ঘর করতে পারব না। ঋণ করে সংসার চালানোই দায়, সেখানে ঘর বানাবো কীভাবে?
একই অবস্থা পানবিক্রেতা রফিকের। রফিক বলেন, ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে ছবি তোলায় আমাদের লজ্জা লাগে। আমরা চাই কাজ আর মাথা গোঁজার একটি ছোট জায়গা। রাষ্ট্র যদি আমাদের পাশে না দাঁড়ায়, এই নিঃস্ব মানুষগুলো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, খানখানাবাদসহ বাঁশখালীর উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তালিকা তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে চলছে।
খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম সিকদার বলেন, মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনার আলোকে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করছি। ত্রাণ সহায়তা চলমান আছে, কিন্তু এখন মূল মনোযোগ পুনর্বাসনের দিকে। আমরা প্রশাসনের কাছে ক্ষতিগ্রস্তদের গৃহ নির্মাণের জন্য বিশেষ অনুদান চেয়েছি।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে সহায়তার আওতায় আনার জন্য কাজ করছি। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান। এ বন্যায় বাঁশখালীতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।
তিনি আরও বলেন, যারা বন্যায় সবকিছু হারিয়েছেন, তাদের তালিকা আমরা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করছি। তাদের মাথাগোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা আসছে এবং বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনের বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রশাসনিক এই তৎপরতায় মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, তাদের দাবি একটাই— তালিকা যেন কোনোভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট না হয় এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীরাই যেন সহায়তার তালিকায় অগ্রাধিকার পায়।
সচেতন মহলের মতে, বন্যা-পরবর্তী সময়ে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং টেকসই পুনর্বাসনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যার তীব্রতা প্রতি বছর বাড়ছে। তাই নতুন করে ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে এখন স্থায়িত্বের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যে ঘরগুলো নির্মিত হবে, তা যেন দুর্যোগ সহনশীল হয়।
এমআর/আরএফ/এমএসএ
