পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও খনির উন্নয়নে নিয়োজিত একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সকে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও ধ্বংস করে দেশের পুরো গ্যাস সেক্টরকে বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১৫ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত আমলে দেশীয় সক্ষমতাকে কোনোভাবেই কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি, বরং সুপরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ খাতটিকে বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার দেশের জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা ফিরিয়ে আনতে বাপেক্সকে পুনরায় সক্রিয় করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলছে এবং সংস্থাটির জন্য নতুন রিগ আমদানিসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সব ধরনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখন থেকে বাপেক্স নিজেই নতুন নতুন গ্যাসকূপ খনন করবে এবং পুরনো কূপগুলোতে গ্যাসের অনুসন্ধান চালিয়ে দেশের অভ্যন্তরেই নিজস্ব জ্বালানির উৎস সম্প্রসারণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশা এবং তা থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকারের বাস্তবমুখী পরিকল্পনার চিত্র বিস্তারিতভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে এবং সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েই বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। যদিও পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী শাসনের কারণে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল এবং সমগ্র বিশ্ব একটি অস্থিতিশীল যুদ্ধ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তবুও জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণে এই সরকার ইতিমধ্যে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করে জানান, বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত পরিশ্রমী, তরুণরা প্রদম্য ও উদ্যমী, কৃষকরা উৎপাদনশীল এবং দেশের উদ্যোক্তারা বিপুল সম্ভাবনাময়। সরকার যদি ব্যবসা-বাণিজ্যের সামনের সকল আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক বাধা দূর করতে পারে, দুর্নীতিকে কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করে সমাজে ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং সর্বোপরি প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে পারে, তবেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রত্যাশিত বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি দেড় দশকের স্বৈরাচার ও দুঃশাসনের ফলে দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধের যে মারাত্মক অবক্ষয় ঘটেছে, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, স্বৈরাচারের কবলে পড়ে শুধু রাজনীতি আর অর্থনীতিই ধ্বংস হয়নি, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোরও চরম ক্ষতি হয়েছে। এই মূল্যবোধকে যেকোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে তিনি ছোটবেলার চিরচেনা ছড়া ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ স্মরণ করিয়ে দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই শৈশবের নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধকে সমাজ ও সংসদে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার সকল সংসদ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের ৫০ জন নারী সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব গ্রহণ করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক-পলিথিন ফেলা বন্ধে দেশব্যাপী সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে সামাজিক সচেতনতা তৈরির তাগিদ দেন।
প্রধানমন্ত্রী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঐতিহাসিক প্রথম বাজেট অধিবেশনের সমাপনী খতিয়ান ও পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ৭ জুন ২০২৬ তারিখে শুরু হওয়া সংসদের চলতি দ্বিতীয় অধিবেশন দীর্ঘ এক মাস নয় দিন ধরে চলার পর আজ সমাপ্ত হতে যাচ্ছে। ১১ জুন ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী কর্তৃক বাজেট উপস্থাপনের পর বাজেট আলোচনার ওপর সরকারি ও বিরোধী দলের মোট ৩১৬ জন সংসদ সদস্য প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ধরে প্রাণবন্ত ও চুলচেরা বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করেছেন। এই দীর্ঘ অধিবেশনে মোট ১১টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে এবং সংসদীয় বিভিন্ন স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাজেট অধিবেশনটি সফল ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দিন-রাত ও ছুটির দিনেও অক্লান্ত পরিশ্রম করায় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সার্জেন্ট অব আর্মস, বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার ও গণপূর্ত বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সহায়কদের রেওয়াজ অনুযায়ী তাদের চলতি এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বিশেষ সম্মানী ভাতা হিসেবে প্রদানের জন্য স্পিকারকে অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
দেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষাকে পবিত্র আমানত হিসেবে ঘোষণা করে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জবাবদিহিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সমাপনী বক্তব্য শেষ করেন।
এসআর/এমএসএ
