বিজ্ঞাপন

বানের জলে বিকল উপার্জনের বাহন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রুবেলের মানবেতর জীবন

বানের জলে বিকল উপার্জনের বাহন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রুবেলের মানবেতর জীবন

বাইর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী তাণ্ডব চলেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বদণ্ডী ধূপীপাড়া গ্রামে রুবেল ধূপীর (৫০) জীর্ণ বসতঘরটির সামনে দাঁড়ালে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন। সামনের অংশটুকু কোনোমতে খাড়া থাকলেও, ভেতরে পা বাড়ালেই চোখে পড়ে বন্যার অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞের এক করুণ চিত্র। ঘরটি এখন আর বসতঘর নেই, পরিণত হয়েছে এক পরিত্যক্ত গুদামঘরে। দেয়ালগুলো ঝরঝরে হয়ে খসে পড়ছে।

টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রুবেলের ঘরের হাঁটুসমান পানি উঠেছিল। সেই পানি যখন নেমে গেল, তখন ঘরটির যে কঙ্কালসার চেহারা বেরিয়ে এসেছে, তা বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, মাটির মেঝে দেবে গেছে, আর ঘরের কোণে কোণে জমেছে বন্যার রেখে যাওয়া আবর্জনা আর স্যাঁতসেঁতে কাদা। যে ঘরটি একসময় সাত সদস্যের পরিবারের জন্য ছিল এক নিরাপদ অভয়ারণ্য, আজ তা ধ্বংসাবশেষে রূপ নিয়েছে। রুবেলের স্ত্রী, পাঁচ সন্তানের রান্নাবান্না ও দুই বেলার আহার জোগানো এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এই এলাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন রুবেল ধূপী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শক্তি কমে আসায় জীবিকার তাগিদে তিনি দৈনিক ৩০০ টাকা জমার শর্তে মালিকের কাছ থেকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ভাড়ায় নেওয়া শুরু করেন। প্রতিদিন ৮০০ টাকার মতো আয় হতো, যা থেকে মালিকের টাকা মিটিয়ে বাকি ৫০০ টাকা দিয়ে কোনোমতে চাল-ডাল কিনতেন। কিন্তু এবারের বন্যার জল শুধু তার ঘরটিকেই অচল করে দেয়নি, বিকল করে দিয়েছে তার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম অটোরিকশাটিকেও। গাড়ির মোটর ও ভেতরের সম্পূর্ণ তারের সংযোগ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

dhakapost
বন্যায় ত্রাণ না পেয়ে অভিযোগ করছেন তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা 

জানতে চাইলে রুবেল ধূপী বলেন, ‘ঘর তো না, যেন একখান ভাঙা গুদামঘর। ঘরের দেওয়ালগুলো হাত দিলেই ঝরঝর করে খসে পড়ছে। কখন যে মাথার ওপর ধসে পড়বে সেই ভয়ে থাকি। কিন্তু এই ভাঙা ঘর ছেড়ে কোথায় যাব? মাথা গোঁজার আর তো কোনো জায়গা নেই।’

রুবেলের চার মেয়ে ও এক ছেলে। আর্থিক অনটনের কারণে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পারায় অনেক আগেই সবার শিক্ষা জীবন থমকে গেছে। উপায়ান্তর না দেখে নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে মাত্র ১০ বছর বয়সী একমাত্র ছেলেকে একটি সেলুনের নরসুন্দরের কাজে দিতে বাধ্য হয়েছেন রুবেল। কিন্তু ঘর ও রান্নার চুলো, দুই-ই যেখানে বন্যার পানিতে বিলীন, সেখানে খাবার জোগানো আর তা মুখে তোলার সংগ্রাম যে কতটা বুকফাটা কষ্টের, তা শুধু রুবেলের পরিবারই অনুভব করছে।

রুবেল আরও বলেন, ‘৩০ বছর ধরে এই রাস্তায় খাটছি। এইবারের মতো এত বড় বিপদ আর কখনো দেখিনি। বানের জল ঘরটারে গোদামঘর বানিয়ে গেল। উনুন জ্বলছে না কতদিন, ঘরে শুকনো চাল চিবিয়ে দিন পার করছি। তার ওপর রুজি-রুটির শেষ ভরসা গাড়িটার মোটর আর তার সব পুড়ে শেষ। এখন আমরা কীভাবে বেঁচে থাকব, সেই পথ সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানে না।’

ধূপীপাড়ায় ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ 

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর উপজেলাটিতে ত্রাণ বিতরণের জোয়ার চললেও রুবেলের মতো এই পাড়ার অসংখ্য পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি এখনো ত্রাণ। অভিযোগ করে স্থানীয় পূর্ণিমা ধূপী বলেন, ‘টিভিতে দেখি কত মানুষ চাল-ডাল পাচ্ছে, সাহায্য পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এই ধূপীপাড়ার ভাঙা ঘরে আজ পর্যন্ত একটা মানুষও এসে খোঁজ নেয়নি। আমরা কীভাবে খাচ্ছি, কীভাবে এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রাত কাটাচ্ছি, তা দেখার কেউ নেই।’

অন্য স্থানীয় বাসিন্দা সনজয় ধূপীর দাবি, ‘রাস্তার পাশের ভাঙাচোরা ভবনের মাঝ দিয়ে যে সরু ঝিরিপথ গেছে, সেটিই আমাদের পাড়ায় আসার একমাত্র রাস্তা। মূল রাস্তা দিয়ে যখন ত্রাণের গাড়িগুলো চলে যায়, তখন তারা বুঝতেই পারে না যে ভেতরে আমাদের এই অসহায় গ্রামটি রয়ে গেছে। এছাড়া এলাকার কিছু মানুষের কারণে সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউই ত্রাণ পায়নি। তারা দিনে এনে দিনে খেলেও হাত পাততে পারেন না। তাদের মতে, এভাবে চেয়ে ত্রাণ নিতে গেলে মান-সম্মান থাকবে না।’

এসএম