বিজ্ঞাপন

বিছানা থেকে মেঝে—ডেঙ্গু রোগীদের ছায়া হয়ে পাশে স্বজনরা

বিছানা থেকে মেঝে—ডেঙ্গু রোগীদের ছায়া হয়ে পাশে স্বজনরা

বর্ষাকাল প্রায় শেষ হতে গেলেও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিন হাসপাতালগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তীব্র জ্বর আর শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে রোগীরা ঠাঁই নিচ্ছেন হাসপাতালের বেড ও মেঝেতে।

রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে মানিকনগর, শাহজাহানপুর, যাত্রাবাড়ী, টিকাটুলীসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত আসছে ডেঙ্গু রোগী। হাসপাতালটিতে শিশুদের জন্য আলাদা এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিস্তেজ ও মলিন মুখে ওয়ার্ডের বিছানায় কিংবা মেঝেতে শুয়ে আছেন বহু মানুষ। তবে এই যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিতে রোগীদের পাশে রাত-দিন ছায়ার মতো জেগে আছেন তাদের প্রিয়জনরা। স্বজনদের নিরলস সেবায় দ্রুত সুস্থতার প্রহর গুনছেন রোগীরা। 

নন্দীপাড়া থেকে এসে মুগদা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ষাটোর্ধ্ব আশরাফ হোসেন। তিন দিন ধরে শয্যাশায়ী এই বৃদ্ধের চোখ দুটি টলটলে লাল হয়ে আছে, কণ্ঠে জড়িয়ে যাচ্ছে জড়তায়। তিনি বলেন, ’তিন দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। সারা শরীরে, হাত-পায়ে ব্যথা। টেস্ট করেছি কিন্তু ডেঙ্গু ধরা পড়েনি, আজকে আরও কয়েকটা টেস্ট দিয়েছে। তবে হাত-পায়ের ব্যথার জ্বালায় বাঁচি না।’ কথাগুলো বলতে বলতেই নিস্তেজ হয়ে পড়া বৃদ্ধ বাবাকে শক্ত করে ধরে বাথরুমের দিকে নিয়ে যেতে দেখা গেল তার ছেলেকে।

যাত্রাবাড়ী থেকে নিজের ছেলেকে নিয়ে এসেছেন দুলু মিয়া। তিন দিন ধরে ছেলে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় কামকাজ ফেলে রেখে তাকেও পড়ে থাকতে হচ্ছে এখানে। দুলু মিয়া ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে বলেন, ’কাজকর্ম ফেলে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। একটু পর পর বলে, শরীর ব্যথা, পা-হাত টিপে দাও। বউ গেছে বাসায় রান্না-বান্না করে নিয়ে আসতে। সে আসলে পরে আমি যাবো দোকানে। ছেলের অসুখ বলে কয়দিন আর মালিকের কাছ থেকে ছুটি পাবো? তার পরেও যাক, আল্লাহ যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দেয়।’

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের একটি সাধারণ উপসর্গ হলো মুখের তীব্র অরুচি। কোনো কিছু খেলেই শুরু হয় বমি। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর পাশে থাকা স্বজনরা নাছোড়বান্দা। এক রোগীর স্বজন বলেন, শরীর একদম শক্তিহীন হয়ে পড়েছে, ধরে ধরে বাথরুমে নিতে হয়। কিছুই খেতে চান না, খেলেই বমির ভয় করেন। তবু জোর করে, বুঝিয়ে-শুনিয়ে একটু একটু করে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন তারা।

হাসপাতালের পাশের বিছানায় দেখা গেল অন্য এক পারিবারিক ভালোবাসার চিত্র। ছোট ভাই আব্দুল্লাহ মনোযোগ দিয়ে মালিশ করে দিচ্ছেন বড় ভাইয়ের মাথা। নড়াইল থেকে এসে তারা দুজন যাত্রাবাড়ীতে একসঙ্গে থাকেন। ভাই অসুস্থ হওয়ার পর থেকে দিন-রাত ছায়ার মতো পাশে আছেন আব্দুল্লাহ। মাঝেমধ্যে ভাইয়ের বন্ধুরাও এসে দেখে যাচ্ছেন।

সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছোট শিশুদের বাবা-মায়েরা। একদিকে তীব্র শারীরিক কষ্ট ও শরীর ব্যথা, অন্যদিকে হাসপাতালের বদ্ধ পরিবেশ—সব মিলিয়ে শিশুরা মারাত্মক অস্থির হয়ে পড়ছে। মানিকনগর থেকে আসা ঝরনা নামের এক মা তার কষ্ট বর্ণনা করে বলেন, ’বাবা বাড়িতে বেড়াতে এসে ছেলের এ অসুখ হলো। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোক আমাকে দোষ দেয়, বেড়াতে এসে ছেলের অসুখ বাধিয়েছি। স্বামীও রাগ করে হাসপাতালে কম আসে। আমিই আছি এখন হাসপাতালে ছেলের সঙ্গে। স্বামী যা প্রয়োজন সব এসে দিয়ে যায়, মার বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে যায়। ছেলে কিছুই খেতে চায় না, অস্থিরতা করে বেশি। মোবাইলে কার্টুন ছেড়ে দিয়ে এখন ডাবের পানি দিয়েছি, খাচ্ছে।’

চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, ডেঙ্গু রোগীর সুস্থতার জন্য সঠিক চিকিৎসা, পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। আর এ কঠিন যাত্রায় সবচেয়ে বড় ওষুধ হয়ে উঠছে প্রিয় মানুষদের মানসিক ও শারীরিক সেবা-শুশ্রূষা। ওষুধ আর খাবারের পাশাপাশি মা, বাবা, ভাই বা বন্ধুর নিঃস্বার্থ সেবাই নিস্তেজ ডেঙ্গু রোগীদের দ্রুত সুস্থ করে তুলছে।

আরএফ