চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে লবণ কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ শ্রমিক। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার ছয়দিন পার হয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখনও কোনো মামলা দায়ের হয়নি। পুলিশ বলছে, বারবার অনুরোধের পরও নিহতদের পরিবার লিখিত অভিযোগ দিতে রাজি হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকেই নিহতদের পরিবারকে ১ থেকে ২ লাখ টাকার ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গোপনে বিষয়টি রফাদফা বা সমঝোতা করার চেষ্টা করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
গত ১৬ জুলাই সকাল ১০টার দিকে বোয়ালখালী পৌরসভার পশ্চিম গোমদণ্ডী বানু মেম্বারটেক এলাকার ‘কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেড’ কারখানায় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন শ্রমিক মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।
তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চারজন মারা যান। বাকি ছয়জনের মধ্যে তিনজনকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়, দু’জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে যান। আর বোয়ালখালীর গোমদণ্ডী এলাকার আবুল খায়েরের ছেলে মো. মাহমুদুল হক চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে মারা গেছেন আজ (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টার দিকে। তার শরীরের ৬৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল।
নিহত অন্য শ্রমিকেরা হলেন— পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হুলাইন গ্রামের এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে নুরুল আলম, বোয়ালখালী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রুহুল আমিনের ছেলে দিদারুল আলম (৩২), পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চরখিজিরপুর গ্রামের বাসিন্দা নুর নবী হৃদয় (২৫) এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের মধুরামপাড়ার বাসিন্দা উজ্জ্বল দাশ (৫৩)।
ঢাকায় স্থানান্তর করা রোগীদের মধ্যে ৪০ শতাংশ শরীর পুড়েছে লিটনের, ২০ শতাংশ সেলিমের এবং জাহেদের ৩৫ শতাংশ।
নিহত শ্রমিক মাহমুদুলের স্বজন মামুন বলেন, আমরা তো তাদের (কারখানা কর্তৃপক্ষ) হাতের নাগালে পাচ্ছি। না পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিতাম। এমন না যে এটা পরিকল্পিত। এটি একটি দুর্ঘটনা।
বোয়ালখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক নিহতের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করছি। তাদের বিভিন্ন উপায়ে মামলা করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ না করায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।’

বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান ফারুক বলেন, ‘যারা মারা গেছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের সাথে কথা বলা হয়েছে। তারা মামলা করবেন না বলে জানিয়েছেন। আর ওটার জন্য একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের প্রেক্ষিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এটা জেলা প্রশাসন থেকে করা হয়েছে। কমিটির সদস্য সংখ্যাটা নির্দিষ্ট বলতে পারছি না। মামলা না করলে তদন্তের প্রেক্ষিতে, মানে তদন্ত রিপোর্টের প্রেক্ষিতে মামলা হবে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না, তা এই মুহূর্তে আমার জানা নেই। আমার শাখা থেকে এ ধরনের কোনো কমিটি করা হলে অবশ্যই আমি অবগত থাকতাম। এমনকি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা কাগজ এখনো আসেনি।’
মুখ খুলছেন না স্থানীয়রা
কারখানা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জানলেও কেউ মুখ খুলছেন না। ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করার পরও কোনো শ্রমিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, কারখানার ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কড়া এবং শ্রমিকদের ওপর অদৃশ্য এক ভীতি কাজ করছে যে, কেউ চাইলেও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কারখানা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা ছিল বলেও জানা যায়।
আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে কারখানা কর্তৃপক্ষের ‘ভিন্ন তৎপরতা’র অভিযোগ উঠেছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, নিহতদের পরিবার যেন আইনি পথে না হাঁটে, সে জন্য কারখানার কয়েকজন কর্মকর্তা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। মাত্র এক থেকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাসে পরিবারগুলোর মুখ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারখানাটিতে নিহত নুরুল আলম তার স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার বোনেরা শুরুতে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কারখানা কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা কৌশলে তার বোনদের ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেছেন। ফলে পুলিশের আশ্বাস সত্ত্বেও মামলার প্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর তারা সবকিছু লুকাচ্ছিলেন। আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তেমন গুরুতর কিছু হয়নি, কেবল ঝালাই বা ওয়েল্ডিংয়ের কাজ চলছিল। ঠিক কী কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। গ্যাস বিস্ফোরণ নাকি এসি বিস্ফোরণ হয়েছে, তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে আসার পর বিষয়টি জানা যাবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা গিয়ে যা শুনেছি, তাতেও তারা আমাদের কাছে বিষয়টি লুকিয়েছিল। পরে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ১০ জন ভর্তি হওয়ার খবর পেলাম, তখনও এলাকার কেউ কিছু জানতো না এবং কারখানার কেউ তা স্বীকার করতে চায়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, কারখানার ভেতরে ও বাইরে কড়া নিরাপত্তা থাকায় বিষয়টি বাইরে কেউ জানে না। কারখানাটির অ্যাডমিন আমাকে জানান, ওয়েল্ডিংয়ের স্ফুলিঙ্গ থেকে পাশে থাকা কাগজে আগুন লেগে যায়। সামান্য ফোসকা পড়ার কারণে এবং স্থানীয় উপজেলা হাসপাতাল না থাকায় তাদের প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। মূলত তেমন কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি, আহত ব্যক্তিরা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
সংসারের স্বপ্ন ছাই, নির্বাক স্বজনেরা
নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সংসারের চরম আর্থিক অনটন কাটাতে দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগে একজন ঠিকাদারের অধীনে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কনফিডেন্স সল্টে কাজে যোগ দিয়েছিলেন উজ্জ্বল দাশ ও নুরনবী হৃদয়।
হৃদয়ের খালা নারগিস আক্তার জানান, দুই বছর আগে বিয়ে করেছিলেন হৃদয়। তার ১ বছর ২ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান/পুত্রসন্তান রয়েছে। হৃদয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার এখন অথৈ সাগরে পড়েছে।
বোয়ালখালী উপজেলার নিহত দিদারুল আলম চার বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। বিয়ে করেছেন ৬ বছর আগে, ৪ বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

দিদারুল আলমের বোনের স্বামী রাজু বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ এখনো দেয়নি, দেবে। আইনগত ব্যবস্থা নেইনি, কারণ এটা দুর্ঘটনা। কেউ হত্যা করলে এটা নিয়ে এগিয়ে যেতাম। কিন্তু উনিসহ চারজন মারা গেছে। চিকিৎসা খরচসহ দাফন-কাফন পর্যন্ত সব খরচ কারখানা থেকে দিয়েছে। আর তাদের সাথে আইনগতভাবে তো আমরা পেরে উঠব না। তার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আশ্বাস তো দেয়নি, বাকিদের যেমন দেয় তেমনই দেবে আরকি।’
এ বিষয়ে কথা বলতে কারখানাটির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মুহাম্মদ বুরহান উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
বন্ধ কারখানায় জেনারেটর বদল, এসি বিস্ফোরণে নরককুণ্ড
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ঘটনার দিন ‘কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেড’ কারখানায় সাধারণ লবণ উৎপাদন বন্ধ ছিল। মূলত কারখানার ভেতরে রক্ষণাবেক্ষণ (মেনটেইন্যান্স) এবং নতুন জেনারেটর স্থাপনের কাজ চলছিল। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেনারেটর রুমে যখন শ্রমিকেরা গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে ঝালাইয়ের (ওয়েল্ডিং) কাজ করছিলেন, ঠিক তখনই বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, শর্ট সার্কিটের পরপরই জেনারেটর রুমের ভেতরে থাকা দুটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) এবং ঝালাইয়ের কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো কক্ষটি একটি বদ্ধ নরককুণ্ডে পরিণত হয়। কক্ষে থাকা শ্রমিকেরা বের হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই আগুনের হলকা ও উত্তপ্ত গ্যাসে তাদের শ্বাসনালীর ভেতরের অংশসহ শরীরের ৪০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ঝলসে যায়। কারখানার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক আগুন নেভানো সম্ভব হলেও, ভেতরে থাকা শ্রমিকদের ততক্ষণে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়।
বোয়ালখালী ফায়ার স্টেশনের সাব অফিসার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অলক চাকমা বলেন, ‘ওখানে গিয়ে আমরা ছোটখাটো আগুন পাই। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে বিস্ফোরণের বিষয়টা এখন পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। ঘটনাটির তদন্ত চলছে, আমাদের জোন উপ-সহকারী পরিচালকের কাছ থেকে তথ্য পাবেন।’
চট্টগ্রাম বিভাগ ফায়ার সার্ভিস জোন-২ এর উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিইনি, মূলত আমাদের ওই স্টেশনের প্রাথমিক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই কাজ চলছে। ভবনটির ফায়ার লাইসেন্স ছিল, তবে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা বহির্গমন সিঁড়িসহ কাঠামোগত কোনো ঘাটতি ছিল কিনা তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর পরিদর্শন করেছেন এবং তিনিই বিস্তারিত ভালো বলতে পারবেন।’
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কারখানাটির ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে ভবনের বা কাঠামোগত অনুমতি নেওয়া হয়। তবে কারখানার ভেতরের প্রক্রিয়া, কার্যক্রম এবং শ্রমিক নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। অনুমোদন নেওয়ার পর থেকে কর্মকর্তারা নিয়মিত কারখানাটি পরিদর্শন করেছেন। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পূর্বেও বিগত জুন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে কারখানাটি পরিদর্শন করা হয়।
আরও জানা যায়, পরিদর্শনকালে শ্রমিকদের বিভিন্ন নিরাপত্তা ঘাটতি পরিলক্ষিত হওয়ায় কারখানা কর্তৃপক্ষকে সংশোধনের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সে বিষয়ে আশানুরূপ কর্ণপাত করেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুর্ঘটনাটি ঘটার আগে চলতি বছরের ৬ জুলাই নিরাপত্তা অবহেলার কারণে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছামিউল আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
অধিদপ্তরের পরিদর্শক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর কারখানাটির কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহতদের ইতোমধ্যে অর্ধেক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, বাকিটা পরবর্তীতে পরিশোধ করা হবে এবং শেষে নিহত দুজনেরও পরিশোধ করা হবে। আমরা মালিকপক্ষকে বলেছি নিহতদের ক্ষতিপূরণসহ সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে যা যা করণীয়, আমরা সার্বক্ষণিক সবকিছু নজরদারিতে রাখছি।’
জানতে চাইলে সংস্থাটির উপ-মহাপরিদর্শক মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫ জন মারা গেছেন এবং ৬ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনার শিকার এবং নিহত শ্রমিকদের শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে ইন্সপেক্টরেট থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু শ্রমিক ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও, আইনি জটিলতা বা ঠিকাদারি ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে গিয়ে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মানবিক ও আইনি—উভয় দিক বিবেচনা করে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।’
বিশেষজ্ঞরা দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সচেতনতার অভাবকে দুষছেন। তারা বলছেন, দুর্ঘটনা ঘটার আগে আরও সচেতন হওয়া জরুরি। যেমন বয়লার বা চুল্লি তৈরির সময় পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করে এর পুরুত্ব বাড়ানো এবং শ্রমিকদের জন্য হেলমেটসহ সঠিক সেফটি প্রসিডিউর নিশ্চিত করা।
ঘটনার আইনি দিক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের শ্রম আইনজীবী এস এম ফরমানুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে এটি ফৌজদারি নাকি দেওয়ানি দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ছে। দায়িত্বে অবহেলা, নিরাপত্তা ঘাটতি বা আইন অমান্য করার প্রমাণ পাওয়া গেলে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে আইনগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।
সংস্থাটির প্যারালিগ্যাল রেশমা শাহিন পরিদর্শন শেষে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা ভুক্তভোগী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের পাশে আছি। মালিক পক্ষের কাছ থেকে তাদের চিকিৎসা খরচ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে আমাদের অগ্রাধিকার রয়েছে। তারা যদি আমাদের কাছে আইনি সহায়তা চান, তবে আমরা সব ধরনের আইনি সাহায্য দেবো। যেহেতু ঘটনাটির তদন্ত এখনো চলছে, তাই তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরেই আমরা পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’
মানবাধিকারকর্মী অ্যাড. জিয়া হাবিব আহসান বলেন, ‘ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে জেলা প্রশাসনের অধীনে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি। এক্ষেত্রে ঠিকাদার ও মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে কেবল নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নয়, বরং শ্রম আইন অনুযায়ী যথাযথ ও সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা উচিত।’
এনএফ
