রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে মধ্যরাতে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ভোরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাগর হোসেন ওরফে বুলেটকে (২৮)। এমন অভিযোগ করেছেন নিহত যুবকের বড় বোন শারমিন বেগম।
গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দিবাগত রাত একটার দিকে সাগরকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন সকালে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সাগর হোসেন।
বোন শারমিন বেগম বলেন, ’আমরা চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে বুলেট ছিল তৃতীয়। আগে সে একটি চকলেট ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। এরপর আর কোনো কাজকর্ম করত না। পরে সে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং বেশ কয়েকবার জেল খাটে। গতকাল বুধবার জানতে পারি কারা যেন আমার ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।’
তিনি বলেন, ’আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। তবে কারা তাকে কি কারণে হত্যা করেছে সে বিষয়টি এখনো জানতে পারিনি। আমার ভাই এখনো বিয়ে করেনি। সে হাজারীবাগ থানার ১৫ নম্বর ভাগলপুর মসজিদের সামনে আলাদা বাসায় থাকতো। আমার বাবার নাম মৃত শাহাদাত হোসেন।’
নিহতের ছোট ভাই শাওন বলেন, ’মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটার দিকে ১৪ বছরের কিশোর ইমন আমার ভাইকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর আমরা সকালের দিকে জানতে পারি আমার ভাইকে কে বা কারা কুপিয়ে হত্যা করেছে। এরপর খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে যাই।’
তিনি আরও বলেন, ’ইমন সব সময় আমার ভাইয়ের সঙ্গে থাকতো। ইমন যদি ওই রাতে আমার ভাইকে ডেকে না নিত তাহলে সে রাতে বের হতো না। আমাদের ধারণা ইমনকে দিয়েই আমার ভাইকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় আমার মা বাদী হয়ে হাজারীবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে। ইমন বর্তমানে হাজারীবাগ থানা পুলিশ হেফাজতে রয়েছে, তবে এ বিষয়ে ইমনের সঙ্গে আমাদের কথা বলতে দেয়নি পুলিশ।’
সুরতহাল প্রতিবেদনে হাজারীবাগ থানা উপ-পরিদর্শক (এসআই) এ বি এম তৌহিদ উল্লেখ করেন, নিহতের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিক হত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা এবং পূর্ব শত্রুতার কারণে প্রতিপক্ষ গ্রুপের দুষ্কৃতিকারীদের আঘাত ও ধারালো অস্ত্রের কোপে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাজারীবাগ থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সাগর আহমেদ বুলেট এলাকার চিহ্নিত পেশাদার ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ী। ডাকাতির প্রস্তুতি মামলাসহ হাজারীবাগ থানায় তার নামে মোট ১১টি মামলা রয়েছে। তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তারও করা হয়। মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে ৩টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পায় পুলিশ। ফোনে বলা হয়, হাজারীবাগ থানাধীন কোম্পানিঘাট ঢাল এলাকায় কে বা কারা ছুরিকাঘাত করে অজ্ঞাত এক যুবককে ফেলে রেখে গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ওই যুবককে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত সাগর আহমেদ বুলেটের সঙ্গে আসামিদের পূর্ব পরিচয় ছিল। স্থানীয়ভাবে বসবাসের সুবাদে বিভিন্ন সময় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই বিরোধের জের ধরে আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। গত ২১ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে হাজারীবাগ থানার কুলাল মহল মসজিদ-সংলগ্ন গলিতে সাগর ও ইমন খান একসঙ্গে অবস্থান করছিল। পরে হুমায়ুন কবির, আকাশ, সাব্বির, মোল্লা ইমনসহ অজ্ঞাতনামা ২ থেকে ৩ জন দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও চাপাতি নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে সাগরের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, হুমায়ুন কবির প্রত্যক্ষদর্শী ইমন খানকে জোরপূর্বক আটকে রেখে চাপাতি প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখান, যাতে তিনি সাগরকে সাহায্য করতে না পারেন। প্রাণ বাঁচাতে সাগর দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে হামলাকারীরা ধাওয়া করে রাত আনুমানিক ২টা ৩৮ মিনিটে ভাগলপুর লেনের ৪৮/১ নম্বর বাড়ির সামনে সাগরকে ধরে ফেলে। এরপর আকাশের হাতে থাকা চাপাতি এবং অন্যদের হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। একপর্যায়ে মাথায় চাপাতির আঘাতে গুরুতর রক্তাক্ত হয়ে তিনি সড়কে লুটিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে হাজারীবাগ থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে একই দিন ভোর আনুমানিক ৫টা ২৫ মিনিটে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
থানা সূত্রে জানা যায়, মামলার তদন্তে এজাহার, সাক্ষীদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, আলামত সংগ্রহ, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও অন্যান্য তদন্ত কার্যক্রমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হুমায়ুন কবির, আকাশ, সাব্বির ও মোল্লা ইমনকে নামীয় এবং আরও ২ থেকে ৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করা হয়েছে। তদন্তের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) যাত্রাবাড়ী থানা এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত দুই আসামি মো. হুমায়ুন কবির ও মোল্লা ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি লোহার রড ও একটি ধারালো ছোরা উদ্ধার করে জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে, যা যাচাই-বাছাই চলছে। এছাড়া পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অন্যান্য অস্ত্র ও আলামত উদ্ধার এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে দুই আসামির সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি ইমন ঘটনার সময় বুলেটের সঙ্গে ছিল এবং তারা সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। এছাড়া ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এই ঘটনায় নিহত বুলেটের মা বাদী হয়ে হাজারীবাগ থানা একটি মামলা দায়ের করেছেন।
ইমনকে খানকে আটক করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বুলেটের সঙ্গে থাকা কিশোর ইমনকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। সে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তার তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছি এবং খুব দ্রুতই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানান তিনি।
এসএএ/আরএফ/এসএম
