চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলজুড়ে প্রায় আট কিলোমিটারের বেশি এলাকা সমুদ্রঘেঁষা হওয়ায় এখানকার মানুষের দিন কাটে নদী আর সাগরের সঙ্গে মিতালি করে, আবার কখনো চরম উৎকণ্ঠায়। উপজেলার বেশিরভাগ অংশে বেড়িবাঁধ জোয়ারের ঢেউ ঠেকিয়ে মানুষকে সুরক্ষা দিলেও, মধ্যম গহিরা বাইঘ্যার ঘাট এলাকার প্রায় ১২০ মিটার অংশ এখনো রয়ে গেছে চরম ঝুঁকিতে।
টানা বর্ষণ ও জোয়ারের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এই অংশটি নিয়ে দিনরাত দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন অর্ধলক্ষাধিক উপকূলবাসী। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
জানা যায়, মূলত এই বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে শুধু স্থানীয়রাই নন, নিয়মিত যাতায়াত করেন মাছবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহন। পাশাপাশি প্রতিদিন স্কুলগামী শিক্ষার্থীরাও এই পথ ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। তবে বেড়িবাঁধের ওপরের অংশটি কাদামাটিতে তৈরি হওয়ায় এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একটু বৃষ্টিতেই মাটি নরম হয়ে কাদা জমে যাওয়ায় রোগী বহন কিংবা শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া এখন এক রকম ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এই অংশ দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার না হলে যেকোনো বড় জোয়ার বা ঘূর্ণিঝড়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করছেন তারা।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, বাইঘ্যার ঘাট এলাকার সেই ঝুঁকিপূর্ণ ১২০ মিটার অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনায় আগে থেকেই জিও টিউব দেওয়া হয়েছে। তবে বাঁধের ভঙ্গুর দশা দেখে এলাকার সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে এখনো ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
সকালের দিকে দেখা যায়, কাদামাটি ও খানাখন্দে ভরা এই সরু বাঁধের ওপর দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে এলাকার স্কুলগামী কোমলমতি শিশুরা। একটু পরপরই মাছবোঝাই ভারী ট্রাক যাতায়াত করায় মাটি কেঁপে উঠছে, যা আতঙ্কে ফেলছে পথচারীদের। কাদা আর স্লিপারি রাস্তার কারণে কোনো রোগী বা প্রসূতিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন পড়লে অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ি তো দূরের কথা, মূল সড়কে নেওয়াও এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয়দের আশা, অস্থায়ী এসব জিও ব্যাগের পাশাপাশি দ্রুত যেন স্থায়ী কংক্রিট বা টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের মূল কাজটি শুরু হয়, যাতে আসন্ন বর্ষা বা জলোচ্ছ্বাসের আগেই তাদের ঘরবাড়ি ও জীবন পুরোপুরি নিরাপদ হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাইগ্যের ঘাটের এই অংশটুকু যদি স্থায়ীভাবে বাঁধ দিয়ে ভাঙন রোধ করা যায়, তাহলে আমাদের জীবন ও ঘরবাড়ি রক্ষা পাবে। আগামী বর্ষায় বাঁধ দিয়ে পানি ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশে আমরা খুব দ্রুত সরকারের কাছে একটি টেকসই বেড়িবাঁধ চাই।’
আরেক স্থানীয় যুবক আহমদুর রহমান মোকা বলেন, ‘বেড়িবাঁধটি এ ইউনিয়নের মানুষের রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এই বর্ষায় বাঁধের প্রায় দুই থেকে তিন ফুট অংশ ভেঙে গেছে। বাকি আছে মাত্র দুই থেকে আড়াই ফুটের মতো, যা কোনোমতে এখানকার মানুষের জীবনভাগ্য টিকিয়ে রেখেছে।’
জেলে সালেহ আহমদ বলেন, ‘বাঁধের কাজ করা না হলে পানির সাথে ঘরবাড়ি মিশে তলিয়ে যাবে। আমরা সবসময় চিন্তিত থাকি বাধের সামান্য এই অংশটুকুর কারণে এখানকার মানুষ জীবন ও শেষ-সম্বল নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।’
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. সেলিম বলেন, ‘বাঁধের কাজ কেন হচ্ছে না সেটি বলতে পারছি না। আমাদের এমপি মহোদয় বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছেন, যাতে এ জনপদের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ইতি ঘটে। এই বর্ষায় আমরা পানিবন্দি ছিলাম, এখানে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে যাবে।’
৩ নম্বর রায়পুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. ছালেহ আহমদ জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বাঁধের মাটি সরে গেছে। সামনে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো বড় আঘাত এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশ মোকাবিলা করতে পারবে না। দ্রুত এ বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে উপকূলের মানুষ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে আনোয়ারা উপকূল রক্ষায় প্রায় ৫৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জুনে। এর আওতায় পোল্ডার-‘এ’ ও পোল্ডার-‘বি’ এলাকায় প্রায় ৪৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ উন্নয়ন করা হয়। তবে মধ্যম গহিরা বাইঘ্যার ঘাটের ১২০ মিটার এবং ঘাটকূল এলাকার প্রায় ৭০০ মিটার বাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে স্বস্তির খবর হলো, একনেক অনুমোদিত নতুন প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে ২.৭৭৫ কিলোমিটার এবং জুইদণ্ডী ইউনিয়নে ২.৪০০ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আনোয়ারায় বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসনের কাজ চলছে। আমাদের অংশের প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার কাজ শেষ পর্যায়ে। বাইঘ্যার ঘাটের ১২০ মিটার অরক্ষিত অংশও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে স্থায়ী কাজ করা হবে। এর আগে ঝুঁকি এড়াতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব দিয়ে অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হবে। আমরা আশা করছি, জুন ২০২৭-এর মধ্যেই প্রকল্পের সব ভৌত কাজ সম্পন্ন হবে।’
পাউবো বলছে, অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ শুরু হলে দীর্ঘদিনের ঝুঁকি দূর হবে এবং আনোয়ারার উপকূলীয় জনপদ পাবে আরও টেকসই সুরক্ষা। আর সেই কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের অপেক্ষায় উপকূলের হাজারো মানুষ।
এমআর/বিআরইউ
