বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামে নির্ধারিত গন্তব্যে যায় না গণপরিবহন, পকেট কাটছে যাত্রীদের

চট্টগ্রামে নির্ধারিত গন্তব্যে যায় না গণপরিবহন, পকেট কাটছে যাত্রীদের

চট্টগ্রাম নগরীতে রুট পারমিট অনুযায়ী নির্ধারিত গন্তব্য পর্যন্ত না গিয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে আসছে অনেক গণপরিবহন। বেশি যাত্রী পাওয়া যায় এমন অংশে বারবার যাতায়াত করে অতিরিক্ত ট্রিপ ও টাকার আশায় অনেক গণপরিবহন নির্ধারিত রুটে চলাচল করছে না। ফলে প্রতিদিন লাখো যাত্রীকে একাধিক গাড়ি বদলে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। এতে দ্বিগুণ, কখনো তিনগুণ পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়।

বিআরটিএর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগরীর ২০টি রুটে ১ হাজার ৮০টি বাস ও মিনিবাস, ১৭টি রুটে ১ হাজার ১৩৬টি হিউম্যান হলার এবং ২২টি রুটে ১ হাজার ৭২১টি অটোটেম্পো চলাচলের অনুমোদন রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ‘চট্টগ্রাম স্ট্র্যাটেজিক আরবান ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান’ অনুযায়ী, নগরীতে প্রতিদিন আনুমানিক ৫৯ থেকে ৬৭ লাখ ট্রিপ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ৬৫ থেকে ৭১ শতাংশ যাত্রী অর্থাৎ ৩৮ লাখের বেশি মানুষ প্রধান বাহন হিসেবে বাস, টেম্পো ও হিউম্যান হলারের মতো গণপরিবহন ব্যবহার করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ৩৮ লাখ যাত্রীর মাত্র ২০ শতাংশের কাছ থেকেও যদি ৫ টাকা করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়, তবে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮ লাখ টাকা। বাস্তবে প্রতিদিন আরও বেশি মানুষকে গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। যার ফলে চালকেরা গড়ে প্রতিদিন যাত্রীদের পকেট থেকে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের নির্ধারিত রুটগুলোতে নিয়মিত গাড়ি পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ গণপরিবহনই ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে যাতায়াত করে। উদাহরণস্বরূপ, নগরীর ফতেয়াবাদ থেকে অক্সিজেন, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, প্রবর্তক, মেহেদীবাগ ও কাজীর দেউড়ী হয়ে নিউমার্কেট পর্যন্ত ৩ নং বাসের রুট। নিয়ম অনুযায়ী নিউমার্কেট থেকে যাত্রা শুরু করে শেষ গন্তব্য ফতেয়াবাদ পর্যন্ত যাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত উপার্জনের আশায় চালকরা তা করেন না; বরং যেসব অংশে যাত্রীর চাপ বেশি, সেখানেই তারা গাড়ি চালান। 

এছাড়া রাত ১০টার পর কিংবা বৃষ্টি নামলেই দ্বিগুণ ভাড়া হাঁকানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী, রুট পারমিট ছাড়া অথবা নির্ধারিত রুটের বাইরে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এমনকি ট্রাফিক পুলিশ চাইলে সরাসরি গাড়ি ডাম্পিং বা জব্দও করতে পারে

একই চিত্র দেখা যায় ১৬ নং অটোটেম্পো রুটেও, যা ফতেয়াবাদ থেকে অক্সিজেন হয়ে দুই নম্বর গেট ও প্রবর্তক পর্যন্ত চলার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই পুরো রুটটিকে ভেঙে তিন ভাগে গাড়ি চালানো হয়, চকবাজার থেকে দুই নম্বর গেট, দুই নম্বর গেট থেকে অক্সিজেন এবং অক্সিজেন থেকে ফতেয়াবাদ। অন্যদিকে ১৭ নং রুটে চকবাজার থেকে কাজীর দেউড়ী ও লালখান বাজার হয়ে আগ্রাবাদ-বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত হিউম্যান হলার চলার নিয়ম থাকলেও সেগুলো চকবাজার থেকে লালখান বাজার বা টাইগার পাস পর্যন্ত যায়। শুধু এই দুই-একটি রুটই নয়, নগরীর প্রায় প্রতিটি রুটেই চলছে একই ধরনের নৈরাজ্য।

তবে চালকদের দাবি, তারা রুট পারমিট মেনেই গাড়ি চালান। কিন্তু দিনশেষে মালিকের নির্দিষ্ট জমা নিশ্চিত করতে বেশি যাত্রী থাকা অংশগুলোতে বাড়তি ট্রিপ দিতে বাধ্য হন।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী, রুট পারমিট ছাড়া অথবা নির্ধারিত রুটের বাইরে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এমনকি ট্রাফিক পুলিশ চাইলে সরাসরি গাড়ি ডাম্পিং বা জব্দও করতে পারে। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা ও কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবেই ভেস্তে যাচ্ছে সব উদ্যোগ।

শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে জিইসিতে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. শাহীন। তিনি বলেন, ‘টেম্পুতে করে সরাসরি জিইসি যাওয়া যায়। কিন্তু বেশিরভাগ গাড়ি জিইসি মোড় পর্যন্ত যায় না। কেউ যায় রাহাত্তারপুল অথবা বহদ্দারহাট পর্যন্ত। তখন সেখান থেকে নেমে আরেকটি গাড়িতে করে জিইসি যেতে হয়। এর কারণে ২৫ টাকা ভাড়ার জায়গায় ভেঙে ভেঙে গেলে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা চলে যায়। এরপর আবার আরেক টেম্পু বা বাসে উঠতে হয়। প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় বাড়তি ২০ থেকে ৩০ টাকা খরচ হচ্ছে।’

ব্যবসায়ী এনাম হোসেন চৌধুরী বলেন, যেখানে একবার ভাড়া দিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে দুইবার ভাড়া দিতে হচ্ছে। পরিবহন মালিকদের লাভ হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো কোনো বাস চালক ও হেলপার যাত্রী বেশি পাওয়া যায় এমন অংশে বারবার ঘুরে ট্রিপ দেন। এতে দীর্ঘ রুটের যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক সময় নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে দুটি বা তিনটি বাস পরিবর্তন করতে হয়।

ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, রুট পারমিট অনুযায়ী গন্তব্য পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচল নিশ্চিত করতে বিআরটিএ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযান জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত রুটে না চলা পরিবহনের বিরুদ্ধে জরিমানা, রুট পারমিট স্থগিত এবং পুনরাবৃত্তি হলে বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শাহ আমানত সংযোগ সড়ক থেকে আগ্রাবাদ সড়কে চলা ৪ নং বাসের চালক আজিম উদ্দিন বলেন, বেশিরভাগ সময় গাড়ি নতুন ব্রিজ (শাহ আমানত সেতু) থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত যায়। কিন্তু মাঝখানে জিইসিতে যানজট থাকায় অনেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত যায় না। আবার অনেকে আগ্রাবাদ থেকে সরাসরি ফ্লাইওভার হয়ে বহদ্দারহাট যায়, কিন্তু নতুন ব্রিজ যায় না। সময় বাঁচানোর জন্য অনেক চালক বাধ্য হয়। যখন যানজট থাকে না, তখন নির্ধারিত রুটে গাড়ি চলে।

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান বলেন, রুট পারমিট অনুযায়ী বেশিরভাগ গাড়ি চলে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়। সিটিতে কিছু চালক নির্ধারিত গন্তব্যে যায় না, এটা সত্য। তবে আমরা সবসময় বলে আসছি যাতে যাত্রীদের কোনো ভোগান্তি না হয়। অনেকে মালিকদের দোষ দেন। কিন্তু গাড়ির মালিক প্রতিদিন একই অংকের টাকা পায়। ড্রাইভার বেশি আয় করলে সেটি মালিক পায় না।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আরটিসিতে (আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি) যাত্রী পক্ষের কেউ নাই। আছে পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা, মালিক ও শ্রমিকেরা। যাত্রীর হয়ে কথা বলার কেউ নাই। ভাড়া বেশি আদায় করার জন্য চালকেরা নির্ধারিত রুটে গাড়ি না চালানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বারবার এই বিষয়ে অভিযোগ দিলেও সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা নেননি। একটি শহরের ৭০ ভাগ মানুষের কথা কেউ চিন্তা করছে না। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, সড়কে নৈরাজ্যের বিষয়টি নিয়ে আমরা নিয়মিত কাজ করছি। যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে কীভাবে কাজ করা যায়, সেটি নিয়ে বিআরটিএ শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আমরা আলোচনা করবো।

সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক দক্ষিণ) মোহাম্মদ লেয়াকত আলী খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সড়কে গণপরিবহন রুট পারমিট অনুযায়ী চলছে কি-না, সেটি তদারকির কাজ সবসময় করা হচ্ছে। অনিয়ম করলে আমরা নিয়মিত মামলা, জরিমানা করছি ও গাড়ি আটকে রাখছি। কিন্তু কত গাড়িই বা আটকে রাখবো, জায়গা কোথায়? গণপরিবহনে শৃঙ্খলার জন্য মালিকপক্ষ, চালক, যাত্রী সবাইকে সচেতন হতে হবে। আইন মানার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। তা না হলে পুলিশের একার পক্ষে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, রুট পারমিট না মানায় আমরা গাড়ি আটক করার পর দেখা যায় অনেক চালক চাবি দিয়ে চলে যায়। মালিককে এসে জরিমানা দিতে হয়। তারাও চালকদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। মালিকেরা আমাদের কাছে অনুরোধ করে। এতো এতো গাড়ি ও মানুষকে পুলিশের পক্ষে কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। প্রত্যেকটি গাড়ির ড্রাইভার ও হেলপার নির্ধারিত রুট পারমিট অনুযায়ী যাত্রী নিচ্ছে কি-না বা মাঝপথে ফিরে যাচ্ছে কি-না, তা যাচাই করা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিআরটিএ উপপরিচালক কে এম মাহাবুব কবির বলেন, সড়কে শৃঙ্খলার বিষয়টি দেখাশোনা করে ট্রাফিক বিভাগ। তারা সারাক্ষণ সড়কে থাকে। আমরা যখন মোবাইল কোর্ট চালাই, তখন কোনো অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে সাথেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

আরএমএন/এমএসএ