অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পালনকালে টানা তিনটি ভিন্ন সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়ান যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দায়িত্বকালে বিভিন্ন বক্তব্য, সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের মধ্যে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে তিনি একাধিকবার আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মো. সাহাবুদ্দিনের বিভিন্ন বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে দেওয়া তার বিভিন্ন মন্তব্য বিএনপির পক্ষ থেকে সমালোচিত হয়। এসব বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হয়েও সেই সরকারের পতনকে ‘গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার ভূমিকা নতুনভাবে আলোচনায় আসে। সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করান। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকেও শপথ পড়ান। একসময় যাকে নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন, পরে তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ানোর ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন বক্তব্যেও পরিবর্তনের বিষয়টি নজর কাড়ে। চলতি বছরের একাধিক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
এ ছাড়া বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তার মন্তব্য এবং সিদ্ধান্তও সময়ে সময়েই বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংকটকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, বিভিন্ন দল ও অংশীজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ করছেন শতাধিক মানুষ। তারা বিভিন্ন ব্যানারে বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান নেন।
বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি ব্যানারে বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে বিক্ষোভ করছেন। এর মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে ছাত্ররা, রক্তিম জুলাই’২৪–এর ব্যানারে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত ব্যক্তিরা, ৩৬ জুলাই পরিষদ ব্যানারে একদল মানুষ, জিয়াউর রহমান সমাজকল্যাণ পরিষদের ব্যানারে একদল মানুষ, ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র–জনতার মঞ্চের ব্যানারে কিছু মানুষ বিক্ষোভ করছেন। সব মিলিয়ে শতাধিক মানুষ সেখানে বিক্ষোভ করছেন।
২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মানবজমিন -এর সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ’তিনি শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ বা নথিপত্র নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার যখন বঙ্গভবনে এলেন তখন জানার চেষ্টা করেছি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন কি না? একই জবাব। শুনেছি তিনি পদত্যাগ করেছেন। মনে হয় সে সময় পাননি জানানোর। সবকিছু যখন নিয়ন্ত্রণে এলো তখন এক দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এলেন পদত্যাগপত্রের কপি সংগ্রহ করতে। তাকে বললাম, আমিও খুঁজছি।’ ‘জনতার চোখ’ নামে একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে রাষ্ট্রপতির এ বক্তব্য প্রকাশের পরই শুরু হয় তোলপাড়।
ওই দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে মৌখিকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন শেখ হাসিনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার একটি রম্য ছবি পোস্ট করে ছবির ক্যাপশনে তিনি এ কথা বলেন। ফেসবুক পোস্টে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে মৌখিকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন স্বৈরাচারী খুনি হাসিনা। পদত্যাগপত্র নিয়ে বঙ্গভবনে যাওয়ার কথা থাকলেও ছাত্র-জনতা গণভবনের কাছাকাছি চলে এলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন খুনি হাসিনা।’ রম্য ছবিতে দেখা যায়, শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা প্লেনে করে পালিয়ে যাচ্ছেন। নিচে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছেন। ছবির এক কোনায় লেখা রয়েছে, জনগণের দৌড়ানিতে যে দেশ ছেড়ে পালায় তার আবার কীসের পদত্যাগ?
২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সারজিস আলম বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর মতো মানুষ যদি বলেন শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের ডকুমেন্টস তিনি রাখেননি, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার? তাঁর কোথায় থাকা দরকার তা ছাত্রসমাজ নির্ধারণ করবে।’
২৩ অক্টোবর আসিফ নজরুল বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট নিজের মুখের ভাষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং গ্রহণ করেছেন বলে জানান রাষ্ট্রপতি। এরপর একের পর এক কার্যাবলির মধ্য দিয়ে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত উনি পুরো জাতির কাছে বিভিন্নভাবে বারবার নিশ্চিত করেছেন এবং সুনিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং গ্রহণ করেছেন। আজ যদি প্রায় আড়াই মাস পরে বলেন পদত্যাগপত্র দেয়নি, তাহলে এটা এক ধরনের স্ববিরোধিতা হয়, শপথ লঙ্ঘন হয় এবং এই পদে থাকার যোগ্যতা আছে কি না সে সম্পর্কে প্রশ্ন আসে।’
২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বাসভবন বঙ্গভবনের সামনের নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে একদল বিক্ষোভকারী। এ সময় তাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বাধা দিতে দেখা যায়। এর আগেরদিন রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে সমাবেশ ও বিক্ষোভ হয়। সেখানে এক সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করা হয়। একই দাবিতে শাহবাগ ও বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ করে ইনকিলাব মঞ্চসহ কয়েকটি সংগঠন। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, পাবনা, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, ফেনী, মেহেরপুর, নড়াইল ও ঝিনাইদহ থেকে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
২৬ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ করার বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি বিএনপি। দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবে দলটি। সেদিন গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির ৭ নেতার সঙ্গে বৈঠকে করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলটির কয়েকজন নেতা। বৈঠক শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ বিলুপ্ত করার পথে আমাদের সামনে এখন একটি বাধা রাষ্ট্রপতির অপসারণ ইস্যু। গত ২৩ অক্টোবর আমরা জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলাম।’
২৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণ ইস্যুতে সরকারকে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয় এমন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
এদিকে এনসিপি ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি জানালেও রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রতি আস্থা রাখেন। যে রাষ্ট্রপতি বিগত সময়ে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া নিয়ে সমালোচনা করতেন সেই রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বক্তব্য রাখেন। মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের যে ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন, সেটিকে আরও শক্তিশালী ও সময়োপযোগী রূপ দিয়েছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের মহান আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমেই তাদের আত্মত্যাগের যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সদ্য পদত্যাগ করা মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে শপথবাক্য পাঠ করান। একই সঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বে তার সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও শপথ পড়ান তিনি।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে জামায়াত জোটের এমপিদের প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের মধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যে ভাষণ দিলেন, তাতে মিশে থাকল ভাগ্যের পরিহাস। শেষ সময় বিএনপি সরকারের গুণগান গাইতেও দেখা যায়।
তাকে বার বার বলতে হল, আওয়ামী লীগ সরকার ছিল ‘ফ্যাসিস্ট’। আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান’ বানিয়েছিল। পরে বিএনপি সরকারের ‘কঠোর পদক্ষেপে’ বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান, হওয়ার কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ ‘মুক্তি পেয়েছিল’।
বিএনপি সরকার তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে দেশের জন্য কী কী করবেন, তার বিস্তারিত ফিরিস্তি রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে দিলেন। তিনি ভাষণ শেষ করলেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন অতীতে বক্তব্য শেষ করতেন ‘জয় বাংলা’ বলে। বিএনপি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করে এলেও আওয়ামী লীগ তা সব সময় প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০২৪ সালের ৫ অাগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ রাষ্ট্রপতি ‘জয় বাংলা’ ছাড়াই শেষ করেন।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে গেলেও রাষ্ট্রীয় কোনো আয়োজনে তার বক্তব্য দিতে দেওয়ার সুযোগ হয়নি।
নির্বাচনে জিতে বিএনপির নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর গত ৬ মার্চ প্রথম কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মো. সাহাবুদ্দিন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে জাতীয় পাট দিবসের ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শেষ হয় বিএনপির ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দিয়ে, যা নিয়ে সেদিনও আলোচনা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সি সাহাবুদ্দিন। এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নামে চিনত।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
এমনকি সংসদে যে ভাষণ রাষ্ট্রপতি দেন, তাও মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হতে হয়। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, সরকারের নীতি ও কর্মপরিকল্পনার কথাই তিনি ওই ভাষণে তুলে ধরেন। ফলে নিজের দর্শন ও অবস্থান তুলে ধরার খুব বেশি স্বাধীনতা কার্যত তার থাকে না।
অধিবেশনে যখন ভাষণ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হল, বিরোধী দলের আসনে থাকা জামায়াত জোটের এমপিরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। এ সময় তারা ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা লাল রঙের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে প্রচলিত রীতিতে সংসদ নেতা ও সরকারি দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের একটি অংশ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নিজেদের আসনে বসে থাকেন।
বিউগলে জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সংসদের কর্মকর্তারা জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সদস্যদের দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তখন কেউ কেউ দাঁড়ালেও কয়েকজন সদস্য বসেছিলেন। এসময় জামায়াত জোটের সদস্যদের প্রতিবাদ বন্ধ রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদে তার ভাষণ শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা হট্টগোল করতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণের শুরুতেই বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। হাজারো শহিদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল এবং এই নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন।
‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির আন্তরিক উদ্যোগ এবং সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। জাতীয় সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের পাশাপাশি কয়েকজন স্বতন্ত্র সদস্যও রয়েছেন।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি এই সংসদে আপনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। জাতীয় সংসদের সব সদস্যের প্রতিও রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন।’
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারদলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে স্বাগত জানান।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া সাহাবুদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল ‘ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে’ জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সমাজ বিনির্মাণ।
২০২৬ সালের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদে দেওয়া এক ভাষণেও সাহাবুদ্দিনের বক্তব্য ব্যাপক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ওই ভাষণে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল।
এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণেও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি বলেন— ‘গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে।’ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার এই দুই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে যে সরকারের আমলে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, সেই সরকারের পতনকে ‘গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন’ হিসেবে উল্লেখ করায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
আমি ভেসে আসিনি
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ জেলা পাবনায় নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া একটি তাৎক্ষণিক মন্তব্যের মাধ্যমেই মো. সাহাবুদ্দিন ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। ২০২৩ সালের ১৬ মে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর নিজ জেলা পাবনায় নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেন সাহাবুদ্দিন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ শুরু হয় কালবৈশাখী ঝড়। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব (এডিসি) তাকে ঝড় ওঠার বিষয়টি অবহিত করেন।
এ সময় বক্তব্য দিতে দিতেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলে ওঠেন— ‘কিসের ঝড়, ঝড় উঠুক, আমিই তো এখানে ঝড় ওঠাচ্ছি।’ রাষ্ট্রপতির মুখে এমন তাৎক্ষণিক ও রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হাসির সৃষ্টি হয়। পরে বক্তব্যটির ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বক্তব্যটি ফলাও করে প্রচার করা হয়।
এরপর নিজ জেলা পাবনায় দেওয়া আরেকটি বক্তব্যেও আলোচনায় আসেন সাহাবুদ্দিন। নিজের রাজনৈতিক অতীতের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন— ‘আমি ভেসে আসিনি, একেবারে রাজপথ থেকেই বঙ্গভবনে গিয়েছি। পাবনার রাজপথ থেকে বঙ্গভবনে গিয়েছি।’
এমএসআই/এমএন
