চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ে গত আট বছর ধরে একদল বন্য হাতির নিয়মিত অবস্থান স্থানীয় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। চলতি বছরের এপ্রিলে পাহাড় ছেড়ে হাতিগুলো বাঁশখালী বনে ফিরে যাওয়ার পর এলাকাবাসীর মনে স্বস্তি ফিরে এলেও মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সেই স্বস্তি আবারও রূপ নিয়েছে গভীর আতঙ্কে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধ্যার পর থেকে বৈরাগ ইউনিয়নের উত্তর গুয়াপঞ্চক এলাকার বাসিন্দারা একটি হাতিকে লোকালয় ও কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যে হাতির উপস্থিতির সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুই উপজেলার মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক এলাকার মাহমুদ উল্ল্যাহ পাড়ার ওসমান গণির বাড়িতে হাতির আক্রমণের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর দেয়াঙ পাহাড় এবং এর পাদদেশীয় এলাকায় হাতি-মানুষের সংঘাতে বিগত বছরগুলোতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ২৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে হাতির আক্রমণে এবং পায়ে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ কাশেম ওরফে দুলাল, রেহেনা আক্তার, হালিমা খাতুন, মোহাম্মদ সৈয়দ ওরফে লুতু মিয়া, এবং আকবর আলীর মতো স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ ছাড়া গত কয়েক বছরে হাতির আকস্মিক হামলায় গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন অন্তত শতাধিক মানুষ। ফসলের মাঠ থেকে শুরু করে বসতবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় এখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বারবার থমকে গেছে।
হাতির আকস্মিক এই আক্রমণে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মুহাম্মদপুর এবং ফকিরখীল এলাকায় বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাতির আক্রমণে মুহাম্মদপুর এলাকার ডাক্তার ফয়জুর রহমান বাড়ির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ (৫০) একাধিক বাসিন্দার বসতঘরের পাকা দেওয়াল ভেঙে গেছে এবং গোলায় থাকা ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘শনিবার ভোররাতে বিকট শব্দ শুনে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি হাতি পাশের কক্ষের দেওয়াল ভেঙে ধানের বস্তা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাই।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মানুষ ও হাতির মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন এবং লোকালয়ে বন্য হাতির প্রবেশ রোধে ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) কাগজে-কলমে থাকলেও রাতের বেলায় বন্য হাতির আনাগোনা বাড়লেও তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না।
স্থানীয়দের দাবি, জনজীবন সুরক্ষায় বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর নজরদারিতে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বন্যহাতি সাধারণত তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত করিডোর বা চলাচলের পথ ধরে যাতায়াত করে। কিন্তু দেয়াঙ পাহাড় এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটা, জঙ্গল ধ্বংস এবং কেইপিজেডসহ বিভিন্ন শিল্প স্থাপনা গড়ে ওঠায় হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ ও আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে খাদ্যের সন্ধানে হাতিগুলো প্রায়ই লোকালয়ে হানা দেয়।
বাঁশখালী জলদী রেঞ্জ অফিসের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, আনোয়ারা ও কেইপিজেডের পাহাড়ে হাতি ফিরে আসার বিষয়টি তারা শুনেছেন। এপ্রিলে বাঁশখালী বনে হাতি ফিরে যাওয়ার পর গত তিন মাস পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও শুক্রবার সন্ধ্যায় একটি হাতি পুনরায় লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে তাদের ইআরটি টিমের সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। অতীতে হাতির আক্রমণে হতাহতের ঘটনায় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বন বিভাগ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতো।
এদিকে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘আনোয়ারায় হাতি আসার খবরটি স্থানীয়দের মাধ্যমে শুনেছি। বন বিভাগকে বিষয়টি জানানো হবে এবং স্থানীয়দের সতর্ক থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।’
দীর্ঘদিন ধরে বন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা রিতু পারভী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হাতির করিডোর বন্ধ করা যাবে না। সরকার এবং কেইপিজেড কেন বনের ভেতর তাদের খাবার এবং পানি নিশ্চিত করছে না, আজ অনেকদিন ধরে এই সমস্যা। এতদিনে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা। শুধু ইআরটি টিম আর ক্ষতিপূরণ দিয়ে কিছুতেই সমাধান হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ বন্যপ্রাণীর করিডোর দখল করবে, ওদের বন, খাবার ধ্বংস করবে ওরা তাই লোকালয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক। ওদের আবাস সুরক্ষিত হোক এটাই একমাত্র সমাধান। এর সঙ্গে মানুষ যেন ওদের বিরক্ত না করে। ওরা আলো, শব্দ সেনসিটিভ এ ছাড়া কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও হাতিদের বিরক্ত করে, এগুলো সব ওদের অশান্ত করে তোলে। সুতরাং, আপাতত সমাধান সহাবস্থান, ওদের বিরক্ত না করা, কোনো বাড়ির ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। তবে সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে যেতেই হবে।’
এমআর/আরএফ
