বৈঠক করতে মন্ত্রী নিজে গেলেন সৌদি দূতাবাসে- শনিবার (২৫ জুলাই) ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
ঢাকায় সৌদি আরবের দূতাবাসে গিয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়াহর সঙ্গে বৈঠকের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ধর্মমন্ত্রী জানান, সাক্ষাৎকারটি অনুষ্ঠানের জন্য সৌদি দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুরোধ করে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য কিছুদিন বিদেশে অবস্থান করায় উক্ত সাক্ষাৎকারটি নির্ধারিত সময়ে করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে আমার নানাবিধ ব্যস্ততা ও সৌদি রাষ্ট্রদূতের কর্মব্যস্ততার কারণে যথাযথ সময়ে সাক্ষাৎকারটি হয়নি।
কায়কোবাদ জানান, আগামী হজ মৌসুমে হাজিদের অতিরিক্ত বাড়ি ভাড়া ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানোর চিন্তা মাথায় রেখেই বর্তমানে আমি চিকিৎসার জন্য পুনরায় বিদেশ গমনের পূর্ব মুহূর্তে অনেকটা জরুরি ভিত্তিতে সৌদি রাষ্ট্রদূতের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তার সঙ্গে বর্ণিত সাক্ষাৎ করি।
জাতীয় স্বার্থে কূটনীতি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রচলিত কূটনৈতিক প্রটোকল ও আধুনিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা পাশাপাশি চলতে পারে। ধর্মমন্ত্রীর সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা কূটনৈতিক প্রটোকল সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের আলোচনা স্বাভাবিক ও ইতিবাচক। প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক রীতি ও শিষ্টাচারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, তবে একইসঙ্গে বিষয়টি ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করাও সমান জরুরি। উক্ত বৈঠকটি মূলত সৌদি রাষ্ট্রদূতের ব্যক্তিগত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সৌহার্দ্য ও বোঝাপড়া আরও দৃঢ় করার একটি আন্তরিক উদ্যোগ।
ধর্মমন্ত্রী জানান, এর উদ্দেশ্য কখনোই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা বা প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করা বা তার বিকল্প তৈরি করা ছিল না। বরং এটি ছিল একটি সফট ডিপ্লোমেসির অংশ, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।
ধর্মমন্ত্রীর মতে, বর্তমান বিশ্বে কূটনীতি শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রচলিত কূটনীতির পাশাপাশি আজ বিশ্বের প্রায় সব দেশই সফট ডিপ্লোমেসি, অনানুষ্ঠানিক কূটনীতি, কৌশলগত কূটনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং ব্যক্তিগত কূটনীতি সফলভাবে ব্যবহার করছে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য। এগুলো প্রচলিত কূটনীতির বিকল্প নয়; বরং তার কার্যকর পরিপূরক।
তিনি মনে করেন, ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং শীর্ষ নেতারা ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ গ্রহণ করে রাষ্ট্রদূতের বাসভবন, দূতাবাস অথবা পারস্পরিক সম্মত অন্য কোনো স্থানে সাক্ষাৎ করেছেন। এসব অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অনেক সময় আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করে এবং যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনাকে আরও ফলপ্রসূ করে তোলে।
ধর্মমন্ত্রীর দাবি, এ ক্ষেত্রেও মূল উদ্দেশ্য ছিল একটিই—বাংলাদেশের হজযাত্রীদের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষা করা এবং আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আগে সম্ভাব্য সমাধানের ভিত্তি তৈরি করা। দেশের মানুষের কল্যাণে নেওয়া কোনো উদ্যোগকে তার উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং সম্ভাব্য সুফলের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।
তিনি বলেন, “সবার আগে বাংলাদেশ”—এই নীতিই আমাদের সব সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। কূটনৈতিক প্রটোকলের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রচলিত কূটনীতির পাশাপাশি সফট, অনানুষ্ঠানিক, কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং ব্যক্তিগত কূটনীতির মতো বৈধ ও কার্যকর উপায়গুলোও যথাযথভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এটিও উল্লেখযোগ্য যে, অনেক সময় ব্যক্তিগত পর্যায়ের সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগই পরবর্তী আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। তাই এ ধরনের উদ্যোগকে প্রচলিত কূটনীতির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং তার একটি সহায়ক ও পরিপূরক মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।
কায়কোবাদ বলেন, অবশ্যই, যদি এ ধরনের বৈঠকের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরও সমন্বয় করা প্রয়োজন হয়, তবে তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের সমন্বয় ভবিষ্যতের কূটনৈতিক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে এ কারণে দেশের স্বার্থে আন্তরিকভাবে নেওয়া উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, কূটনীতির সফলতা কেবল বৈঠক কোথায় হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; বরং বিচার করা উচিত তা দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা করেছে এবং জনগণের জন্য কতটা ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং আমাদের হজযাত্রীদের কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রতিটি আন্তরিক উদ্যোগকে ন্যায্য, বস্তুনিষ্ঠ এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, “সবার আগে বাংলাদেশ” এই লক্ষ্য অর্জনে প্রচলিত ও আধুনিক উভয় ধরনের কূটনৈতিক মাধ্যমই দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব।
এনআই/জেডএস
