বিজ্ঞাপন

কাফরুলে যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা

যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার মিশনে কিলার ভাড়া করেন হাফিজ

যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার মিশনে কিলার ভাড়া করেন হাফিজ

রাজধানীর কাফরুলে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় চার শুটারকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা এবং অস্ত্র আইনে আলাদা আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। হত্যা মামলাটি ইতোমধ্যে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, আর অস্ত্র আইনের মামলাটি তদন্ত করছে থানা পুলিশ। 

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন, শুটার চঞ্চল মোল্লা, জিহাদ, জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া, মাসুম বিল্লাহ ও দুই সহযোগী নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান ও মো. শাফিন ছৈয়াল। গ্রেপ্তার চঞ্চল মোল্লা পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন।

গোয়েন্দা-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু ছিলেন এ হত্যাকাণ্ডের মূল টার্গেট। কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান হাফিজের নির্দেশে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চঞ্চল মোল্লা, জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া, মাসুম বিল্লাহ এবং জিহাদ নামের চারজন পেশাদার শুটার ঢাকায় ভাড়া করে আনা হয়।

গত ২৩ জুলাই চার শুটারকে ঢাকায় এনে মিরপুরের ‘হোটেল প্রাইম’-এর ৯ তলায় রাখা হয়। ওই হোটেলে বসেই হাফিজ ও তার প্রতিনিধিরা শুটারদের সঙ্গে নিয়ে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার ছক কষে। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হাফিজ শুটারদের ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করেন। 

পরদিন, অর্থাৎ ২৪ জুলাই সন্ধ্যা থেকে চার শুটার ও তাদের সহযোগীরা বাবুকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা মিরপুর-১৩, ই-ব্লকের ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে এসে ঘোরাঘুরি করতে থাকলে বাবুর সহকর্মীদের সন্দেহ হয় এবং তারা শুটারদের পরিচয় জানতে চেয়ে চ্যালেঞ্জ করেন। পরিস্থিতি টের পেয়ে যুবদল কর্মী ইউসুফ এক শুটারকে জাপটে ধরলে, ওই শুটার কোমর থেকে পিস্তল বের করে সরাসরি ইউসুফের বুকে ঠেকিয়ে গুলি চালায়। এতে মূল টার্গেট যুবদল নেতা বাবু অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান ইউসুফ। পালানোর সময় সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লে নালাম সরদার (৪৫) একজন সবজি বিক্রেতা ও মনির হোসেন (৩২) নামে একজন পথচারী গুলিবিদ্ধ হন।

এর আগে চলতি মাসের ৬ তারিখেও একটি গ্যারেজে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন হাফিজ। তবে ওইদিন ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা থাকায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়

ঘটনার পরপর স্থানীয় জনতা অস্ত্রসহ শুটার চঞ্চল মোল্লাকে ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে থানা ও ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে জিহাদ এবং জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া নামে আরও দুই কিলারকে গ্রেপ্তার হয়। একইসঙ্গে কিলারদের ভাড়া করা ও এলাকা চিনিয়ে দেওয়ার অভিযোগে নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান ও মো. শাফিন ছৈয়াল নামে দুই সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। 

নিহত যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, ভবন নির্মাণকাজ (কনস্ট্রাকশন) ও ফুটপাতে চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগি এবং এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান হাফিজের সঙ্গে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছিল। এ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি; মূল দ্বন্দ্বটি তৈরি হয় অর্থনৈতিক লেনদেন ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

আগেও হত্যার চেষ্টা হয়েছিল

এর আগে চলতি মাসের ৬ তারিখেও একটি গ্যারেজে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন হাফিজ। তবে ওইদিন ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা থাকায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়। 

তিনি জানান, কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া চার শুটারকে ঘটনার আগের দিন ‘হোটেল প্রাইম’-এ এনে রাখা হয়। হোটেলের খাতায় ৩ জনের নাম লেখা থাকলেও রুমে ৪ জন অবস্থান করছিলেন; পরবর্তীতে চঞ্চল এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সেখানেই হত্যার পরিকল্পনা ও স্থান নির্ধারণ করা হয়। কিলিং মিশনের মূল পরিকল্পনাকারী হাফিজুর রহমান হাফিজ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে হাফিজ ছাড়াও অন্য কারো ইন্ধন বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা হাফিজকে গ্রেপ্তার করার পর আরও স্পষ্ট হওয়া যাবে। 

ছবি- শুটার চঞ্চল মোল্লা ও জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া

কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু বলেন, ঘটনাটিতে এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছি, থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ভাড়াটে শুটারদের ঢাকায় এনে হোটেলে রাখেন এবং অস্ত্র সরবরাহ করে আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ইতোমধ্যে থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের হাতে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও আমার মনে হয় না, এ ঘটনার সঙ্গে শুধু হাফিজুর রহমান একাই জড়িত। এর পেছনে আরও রাঘববোয়াল জড়িত রয়েছে।

তিনি বলেন, হাফিজুর রহমান হাফিজ নিজে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হলেও তিনি মূলত কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনির সঙ্গে রাজনীতি করেন। জনি মিরপুরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি। ওই মার্কেটের কোনো সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও জনি মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডটি হাফিজকে পরিচালনার জন্য দিয়ে দেন। এই আন্ডারগ্রাউন্ডের গাড়ির গ্যারেজে বসেই বেশ কিছুদিন ধরে আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। হাফিজুর রহমান হাফিজকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই এর পেছনে কারা রয়েছে, সে বিষয়টি বেরিয়ে আসবে। 

ছবি- দুই সহযোগী মো. শাফিন ছৈয়াল ও নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান

কিলিং মিশনে অংশে নেওয়া চার শুটার ঢাকায় এসে মিরপুর-১০ স্টেডিয়ামের পাশে অবস্থিত ‘হোটেল প্রাইম ইন’-এ ওঠার একটি সিসিটিভি ফুটেজ ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে। ফুটেজে দেখা যায়, তিনজন যুবকের মধ্যে দুজন সাদা শার্ট এবং একজন চেক শার্ট পরা ছিলেন, আর তিনজনেরই কাঁধে ব্যাগ ছিল। এর মধ্যে চশমা পরা সাদা শার্ট পরিহিত এক যুবককে হোটেলের রিসেপশনে কথা বলতে দেখা যায়।

হোটেলটির মালিক সুমন আহমেদ জানান, গত ২৩ জুলাই দুপুর ১টা ১২ মিনিটের দিকে ওই যুবকেরা হোটেলে আসেন। তারা নিজেদের যশোরের সিটি কলেজপাড়া এলাকা থেকে চাকরির সন্ধানে এসেছেন বলে জানান এবং তিনজনের আলাদা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জমা দেন। এনআইডি অনুযায়ী তাদের পরিচয় ছিল, মাহাদী হাসান রিয়াদ (২৩), তানভির ইসলাম মোমিন (২৩) ও সাইফুল ইসলাম ইমন (২১)।

ছবি- কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ

পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার পর তারা ৯ তলার ৯০৩ নম্বর রুমে ওঠেন। এর একদিন পর রাতে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এসে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। 

হোটেল মালিকের ধারণা, তারা যে এনআইডি কার্ডগুলো জমা দিয়েছিল, সেগুলো ভুয়া ছিল।

ছবি- হোটেলের রিসেপশনে শুটাররা, তাদের জমা দেওয়া এনআইডি কার্ড

মামলাগুলোর বিষয়ে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর পৃথক দুটি মামলা (একটি হত্যা ও একটি অস্ত্র আইনে) দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় শুটার চঞ্চল মোল্লা, মাসুম বিল্লাহ, জিহাদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, নিহত ইউসুফ আলী (৪৫) বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার সাকরাল গ্রামের মৃত শাহজাহানের ছেলে এবং কাফরুলে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। এ ঘটনায় মাথার পেছনে গুলিবিদ্ধ কাঁচামাল ব্যবসায়ী নালাম সরদার (৪৫) পিরোজপুরের নাজিরপুর থানার হুগলাবনিয়া গ্রামের ইয়াসিন সরদারের ছেলে এবং অপর গুলিবিদ্ধ ফুটপাতের কাপড় ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৩২) মাদারীপুরের শিবচর থানার মালেক শিকদারের ছেলে।

এসএএ/এমএসএ