রাজনীতিতে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদসহ সব পর্যায়ে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারীর প্রতিনিধিত্বের বিধান রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে ২০৩০ সালের মধ্যে তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে ‘নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক রাজনৈতিক দলের নারী কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি।
লিখিত বক্তব্যে রাবেয়া খাতুন শান্তি বলেন, বাংলাদেশের নারী শুধু ভোটার নন; তারা রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক, জনপ্রতিনিধি, আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী এবং রাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার। কিন্তু রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অবস্থান এখনও প্রান্তিক। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অপরিহার্য।
তিনি বলেন, দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে নারীর অধিকারভিত্তিক অভিন্ন দাবিগুলোতে রাজনৈতিক দলের নারী কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন সংস্কার এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সভায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় সরকারের মতো এক-তৃতীয়াংশ নারীর অংশগ্রহণের বিধান, নির্বাচনী সংস্কৃতির পরিবর্তন, নির্বাচনকালীন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন চালু করা এবং রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী আন্দোলনকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেই এগিয়ে নিতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নারী আন্দোলনকে গণমানুষের আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। নারী রাজনৈতিক কর্মী ও নারী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারে একটি ককাস গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে নারীবান্ধব নানা আইন ও নীতি প্রণীত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর সমঅংশগ্রহণ এখনও নিশ্চিত হয়নি। রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটিগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে এবং নারীবিরোধী মনোভাব দূর করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লূনা নূর, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সভাপতি শম্পা বসু, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মিশকাতুল মাশিয়াত, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক মনীষা চক্রবর্তী, নারী মুক্তি সংসদের নেত্রী শাহানা ফেরদৌসী লাকি, শিউলি শিকদার, তিলোত্তমা ইতি ও অ্যাডভোকেট মাকসুদা আখতার লাইলীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নারী নেত্রী।
বক্তারা বলেন, রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব নারীর অংশগ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীকে এখনও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিবর্তন না হলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, সম্পত্তিতে সমঅধিকার, ধর্মভিত্তিক বৈষম্য দূর করা এবং প্রান্তিক নারীদের নিয়ে আরও কার্যকরভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নারী কর্মী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেত্রী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও কর্মকর্তাসহ প্রায় ৬০ জন অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী।
জেইউ/বিআরইউ
