বাংলাদেশ রেলওয়েতে চলমান ইঞ্জিন সংকট, ঘন ঘন লোকোমোটিভ বিকল, ট্রেন পরিচালনায় বিঘ্ন, ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ প্রকল্প বাতিল এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ৩০টি নতুন লোকোমোটিভ কেনার প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি (বিআরপিএস)।
সংগঠনটির দাবি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সক্রিয়ভাবে অস্থিরতা তৈরি করছে, যার প্রভাব পড়ছে যাত্রীসেবা, পণ্য পরিবহন ও জাতীয় অর্থনীতিতে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান মনির লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি ও অভিযোগ তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে মিটারগেজ লোকোমোটিভের তীব্র সংকটে রয়েছে। প্রতিদিন রেলওয়ের মোট ২৬৮টি লোকোমোটিভের প্রয়োজন হলেও সচল অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে গড়ে মাত্র ১৮০টি। এর ফলে প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলে ৩২টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩৬টিসহ মোট ৬৮টি ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে বিলম্ব, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ইঞ্জিন সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এর ফলে প্রায়ই চলন্ত ট্রেনের লোকোমোটিভ বিকল হচ্ছে, ট্রেন নির্ধারিত সময়ে চলতে পারছে না এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শুধু গত ডিসেম্বর মাসেই ৫৫টি লোকোমোটিভ বিকলের ঘটনা ঘটেছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, পূর্বাঞ্চলে আন্তঃনগর, মেইল, কমিউটার ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রতিদিন প্রায় ৮৫টি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও বাস্তবে সচল রয়েছে মাত্র ৭০ থেকে ৭২টি। প্রতিদিন অন্তত ১৫টি লোকোমোটিভের ঘাটতি নিয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু যাত্রী পরিবহনেই নয়, কনটেইনার পরিবহন, জ্বালানি তেল পরিবহন এবং পণ্য পরিবহনেও পড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে রেলওয়ে বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকোমোটিভ থাকলে প্রতিটি ইঞ্জিন থেকে বছরে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব হতো।
মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ প্রকল্প বাতিলের বিষয়টিকে রেলওয়ের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পূর্বাঞ্চলের ইঞ্জিন সংকট অনেকটাই দূর হতো। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রকল্প পরিচালনায় দুর্বলতার কারণে সেটি বাতিল হয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, এডিবির অর্থায়নে ৩০টি নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগ সময়োপযোগী। এ প্রকল্পকে ঘিরে ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। এক্সেল লোড, টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন ও দরপত্রের শর্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলে একটি গোষ্ঠী ক্রয়প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। অথচ বিষয়গুলো ইতোমধ্যে কারিগরি কমিটির সুপারিশ, এডিবির পর্যবেক্ষণ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদনের মধ্যদিয়ে অগ্রসর হয়েছে। দেশের নতুন মিটারগেজ রেললাইনগুলো ১৫ টন এক্সেল লোড বিবেচনায় নির্মাণ করা হলেও পুরোনো কিছু রুটে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে এক্সেল লোডের বিষয়টি একটি কারিগরি ইস্যু এবং সেটি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়ায় লোকোমোটিভ সংগ্রহের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই আগের প্রকল্পের সঙ্গে বর্তমান প্রকল্পের মূল্য তুলনা করার সময় আন্তর্জাতিক বাজার, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে প্রায় ৪৭ হাজার ২৬০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকলেও নিয়োগ বিধিমালা-২০২০-এর বিভিন্ন অসঙ্গতি দীর্ঘদিন ধরে সংশোধন হয়নি। ফলে শূন্যপদ পূরণে বিলম্ব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দক্ষ জনবলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গত পাঁচ বছরে নিয়োগ পাওয়া অনেক কর্মী চাকরি ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক।
সংবাদ সম্মেলন থেকে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—এডিবির অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ক্রয় দ্রুত সম্পন্ন করা, ৭০টি লোকোমোটিভ প্রকল্প বাতিলের কারণ তদন্ত, চলমান ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, রেলওয়ের নিয়োগ বিধিমালা-২০২০ দ্রুত সংশোধন, উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অযাচিত প্রভাব থাকলে তা তদন্ত, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি, রেলওয়ের সর্বোচ্চ পদ ঘিরে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা বন্ধ এবং রেলকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের কারিগরি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কে এম বারী, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি আনোয়ারুল হক, বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক রশিদ, রেলের প্রশ্ন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম প্রমুখ।
এমএইচএন/এসএম
