বাংলাদেশে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার সম্পর্কে বুঝতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, সাম্প্রতিক সময়ে চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার যুক্ততার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী। সেই লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূত সার্জিও গরকে ঢাকায় পাঠাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তিন দিনের সফরে সার্জিও গর ঢাকায় আসছেন।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন গর। পরদিন শনিবার (১ আগস্ট) তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দুটি বৈঠকে আলোচনা কোনো একক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাপক ও কৌশলগত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গর দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সার্জিও গরের সফরের মূল লক্ষ্য হতে পারে বাংলাদেশে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার এবং ঢাকা-ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বুঝতে এবং জানতে চাইতে পারে ওয়াশিংটন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, একই মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন আসলে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে এবং জানতে চায়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরও বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূত ছাড়াও ভারতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন সার্জিও গর। তিনি ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অগ্রগতি জানতে চাইতে পারেন। হয়তো তিনি ভারত সরকারের কোনো বার্তা বাংলাদেশ সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। অন্যদিকে, গত কয়েক মাসে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের মনোভাব বুঝতে চাইতে পারে ওয়াশিংটন। এ ছাড়া, মস্কো এবং আঙ্কারার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে দেশটি।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ বাংলাদেশ সফর করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, হুট করে এই সফরটা হচ্ছে। কী কী নিয়ে আলোচনা হবে, সেগুলো নিয়ে বলার সময় এখনো হয়নি। স্বাভাবিকভাবে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। আলোচনা কোনো একক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে, অনেক কিছুই আসতে পারে। আমরাও তুলতে পারি, তারাও তুলতে পারে।
বাংলাদেশ সফরকালে সার্জিও গর রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করতে পারেন। এ ছাড়া, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার কথা রয়েছে গরের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রাম্পের বিশেষ দূতের সফরে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (এআরটি) স্বাক্ষর করেছিল। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ঢাকা বোয়িং বিমান কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষি পণ্য ও জ্বালানি আমদানি বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
গত ২৩ জুলাই ওয়াশিংটনের ঘোষিত সর্বশেষ শুল্ক পুনর্নির্ধারণের পর বাংলাদেশকে সর্বনিম্ন শুল্ক অর্থাৎ ১০ শতাংশ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। এই পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে ঢাকা। তবে চুক্তির একটি ক্ষেত্র নিয়ে এখনো জটিলতা রয়ে গেছে, সেটি হলো— প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
ওয়াশিংটন বারবার ঢাকাকে চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে কেনাকাটার জন্য উৎসাহিত করেছে। যদিও বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে, তাদের প্রতিরক্ষা ক্রয় কার্যক্রম জাতীয় চাহিদার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

মার্কিন দূতের সফর নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিনিধি এদেশে সফরে এলে আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর করবে। আমরা আশা করি, এ সফরের মধ্য দিয়ে আরও নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বহুপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো আরও সুগম হবে। আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, মানুষে মানুষে যোগাযোগ— সব আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। এসব নিয়ে আলোচনা হবে বলে আমি মনে করি।
জেনেভায় জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মুহাম্মদ সুফিউর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব বর্তমানে ব্যস্ত ইরান-ইসরায়েল নিয়ে। এ ছাড়া, চীন ইস্যু রয়েছে। সুতরাং, তাদের পক্ষে বাংলাদেশ নিয়ে ফোকাস করা সম্ভব নয়। এই যে সফরটা হতে যাচ্ছে, এটা কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের নয়। সফরটি গুরত্বপূর্ণ, তবে অতি তাৎপর্যপূর্ণ নয়। কারণ, এই পর্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আমার মনে হচ্ছে, সার্জিও গর এখন বোঝার জন্য আসবে যে আমরা আসলে কোনদিকে যাব। উনি যেহেতু বিশেষ দূত হিসেবে আসছেন, এই অঞ্চলের সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলো এবং বাংলাদেশ সেটা কীভাবে দেখছে, তা বুঝতে চাইবেন।
সুফিউর রহমান আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও দুই বছর কয়েক মাস আছেন। সেই সময়টাতে আমেরিকানরা বাংলাদেশের সঙ্গে কতটুকু এনগেজ হবে সেটাও হয়তো বোঝা যাবে। এই সফরের একটা তাৎপর্য থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বোঝার চেষ্টা করবেন। আরেকটা বিষয় গুরত্বপূর্ণ; সার্জিও গর যেহেতু ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, তিনি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি কীভাবে হবে বা কতটুকু হবে বা বাধা কোথায় হবে, তা জানতে চাইতে পারেন।
সম্প্রতি ম্যানিলায় আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের। সেই সাক্ষাতে সার্জিও গর উপস্থিত ছিলন। সাক্ষাতে উভয় পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
এ ছাড়া, ম্যানিলায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরবের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছিলেন খলিলুর রহমান। সংশ্লিষ্ট বৈঠকগুলোতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় জ্বালানি, করিডর ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো গুরত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উল্লেখ্য, সার্জিও গর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। ভারতের মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূত হওয়ার আগে গর হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেনশিয়াল পার্সোনেল অফিসের পরিচালক ছিলেন।
এনআই/এসএএস
