ঢাকার আবাসন সংকট নিরসনে হাতে নেওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়েও এখনো পুরোপুরি বসবাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। নাগরিক সুবিধা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নিরাপত্তার অভাবে একদিকে যেমন হতাশ প্লট মালিকরা, তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজউকের দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে নতুন করে।
৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হওয়ার পরও পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সড়ক সুবিধার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিতে এখনো পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠেনি এই নতুন শহর। এমন পরিস্থিতিতে পূর্বাচলে জনবসতি টানতে এবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ আধুনিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
৩১ বছর অতিবাহিত এবং ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, গ্যাস ও নিরাপত্তার অভাবে পুরোপুরি বাসযোগ্য হতে পারেনি পূর্বাচল নতুন শহর। ২৬ হাজার আবাসিক প্লটের বিপরীতে বাস্তবে মাত্র ৩০০টি স্থানে বাড়ি নির্মাণ শুরু হয়েছে। জনবসতি ও প্লট মালিকদের আকৃষ্ট করতে রাজউক এখন ২৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এলাকাটিকে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ডিএমপি এবং ঢাকা ওয়াসার আওতাভুক্ত করেছে সরকার।
পূর্বাচলে ৬ হাজার ১৫০ একর জমি নিয়ে গড়ে তোলা এই বিশাল প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। শুরুর পরিকল্পনা মতে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। ৩০টি সেক্টরে মোট ২৬ হাজার আবাসিক প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা থাকলেও এ পর্যন্ত হস্তান্তর হয়েছে প্রায় ২১ হাজার প্লট। অথচ বাস্তবে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে মাত্র তিনশর কিছু বেশি প্লটে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের নকশা বদলেছে পাঁচবার, আর মেয়াদ বেড়েছে সাত দফায়। সবশেষ যে সময়সীমা ঠিক হয়েছিল, তা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তারপরও পূর্বাচল এখনো সম্পূর্ণরূপে বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
বসতি নির্মাণে প্লট মালিকদের আকৃষ্ট করতে এখন যে আধুনিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সেখানে প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে ১৪ তলাবিশিষ্ট দুটি ভবন, যার আয়তন প্রায় ৪০ হাজার ৪০৩ বর্গমিটার। এই ভবন নির্মাণে বর্গমিটার প্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৭৮ টাকা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭১ কোটি টাকা, যা বাস্তবায়িত হবে রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নে। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
জানা গেছে, দুটি ভবন নির্মাণ ছাড়াও এই প্রকল্পের অধীনে থাকবে ২ হাজার ৯৫০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে রাস্তা ও গাড়ি পার্কিং, ১ হাজার ৬০ মিটার দীর্ঘ সীমানা দেয়াল, ১০টি লিফট এবং নয়টি গাড়ি সংগ্রহ, পাশাপাশি কেনা হবে ৬ হাজার ৫০২টি ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বর্গমিটারপ্রতি ৪২ হাজার টাকা ব্যয় নিয়ে আপত্তি তোলে পরিকল্পনা কমিশন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ব্যয় কমিয়ে রেট শিডিউল অনুযায়ী নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি লিফট ও এসির মূল্য, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ব্যয়, পরামর্শ ফি, গাড়ি ভাড়া, কম্পিউটার, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানানো হয়। এসব খাতের ব্যয় পুনরায় পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া পূর্বাচল প্রকল্পের মেয়াদ সাতবার বাড়লেও নাগরিক সেবার ঘাটতিতে তৈরি হয়নি প্রত্যাশিত আবাসন ব্যবস্থা। পরিবহন সংকট, কাঁচা অভ্যন্তরীণ রাস্তা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের অনিয়মে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন শত শত প্লট মালিক। প্রকল্পটিকে জনমুখী করতে রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নে ১৪ তলা ভবন বিশিষ্ট স্কুল-কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর বিপুল ব্যয়ভার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। নগর পরিকল্পনাবিদরা বারবার নকশা পরিবর্তন ও রাজউকের দীর্ঘসূত্রতাকেই এই ব্যর্থতার মূল কারণ বলে মনে করছেন।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পূর্বাচলকে বসবাসযোগ্য ও জনমুখী করে তুলতে এখানে স্কুল-কলেজের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এই নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হচ্ছে কিনা, সেটাও দেখা দরকার। নির্মাণ খাতেই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়ে থাকে বলে আমরা দেখেছি। এ বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। সরকারি রেট শিডিউল মানা না হলে কেন মানা হচ্ছে না, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও ঢাকা ওয়াসায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলা ও গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার পূর্বাচল প্রকল্পের অংশ ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
সেখানে জানানো হয়েছে, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকা ৩টি জেলার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশের কার্যক্রম অপর্যাপ্ত এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাগরিক সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এছাড়া, প্রকল্প এলাকা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনভুক্ত না হওয়ায় ওয়াসার সেবা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় নাগরিক সেবা, যেমন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ, সংস্কার, সড়কবাতি রক্ষণাবেক্ষণ, মশক নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি কার্যক্রমের পাশাপাশি টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকল্প এলাকাকে বসবাসের উপযোগী করতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্তকরণ আবশ্যক।
সেই সঙ্গে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত পুলিশ কার্যক্রম নিশ্চিতকল্পে প্রকল্প এলাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাভুক্ত করা প্রয়োজন। পূর্বাচল এলাকার কার্যকর, সুষ্ঠু পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার জন্য ঢাকা ওয়াসার অধিক্ষেত্রাধীন করা আবশ্যক। পূর্বাচল প্রকল্প এলাকার নাগরিক সুবিধাদি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এবং সুষ্ঠু প্রশাসনিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলা ও গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার প্রকল্পের অংশ ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবগুলো মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন করেছে।
এদিকে পূর্বাচল নতুন শহর এলাকার সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য প্লট বরাদ্দ গ্রহীতাদের পানির সংযোগ প্রদান করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। চলতি মাস থেকেই থেকে এ কার্যক্রম শুরু করেছে সংস্থাটি।
রাজউকের পরিচালক (বোর্ড, জনসংযোগ ও প্রটোকল) শীলাব্রত কর্মকার জানিয়েছেন, পূর্বাচল নতুন শহর এলাকার সব ধরনের প্লট বরাদ্দ গ্রহীতাদের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্পের আওতায় পূর্বাচল নতুন শহরে গুণগত মানসম্পন্ন পানি সরবরাহের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রথম ধাপের আওতায় ইতোমধ্যে গ্রাহকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে পূর্বাচল নতুন শহরের ০১, ০২, ০৩ ও ০৪ (আংশিক) নম্বর সেক্টরে পানির সংযোগ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া, দ্বিতীয় ধাপে পূর্বাচল নতুন শহরের ০৪, ০৫, ০৬ (আংশিক), ০৭, ০৮ (আংশিক), ০৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫ (আংশিক), ১৬ (আংশিক), ১৮ (আংশিক) এবং ২০ (আংশিক) নম্বর সেক্টরে পানির সংযোগ প্রদান করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সেক্টরগুলোতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

পূর্বাচল বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, পূর্বাচল নতুন শহরকে অতিদ্রুত একটি সুন্দর, বাসযোগ্য এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজউক কাজ করে যাচ্ছে।
তবে এখানে যারা প্লট কিনেছেন, বরাদ্দ পেয়েছেন তারা পূর্বাচল আজও বাসযোগ্য না হওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, আবাসিক-বাণিজ্যিক শহর গড়ে তোলা। যেখানে থাকবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো-প্রশস্ত সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক ও অফিস এলাকা। কিন্তু বাস্তবে এই স্বপ্নের নগরী বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি নানা সুদূরপ্রসারী সমস্যার কারণে।
পূর্বাচলে ৫ কাঠার একটি প্লটের মালিক খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, বহু আগে পূর্বাচলে প্লট কিনলেও পরিবেশগত কারণে এখনো বাড়ি নির্মাণের সাহস করে উঠতে পারছি না। এলাকার বেশির ভাগ অংশ ফাঁকা পড়ে থাকায় নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কাও আমার মতো প্লট মালিকরা এখানে বাড়ি করার কাজ শুরু করছেন না। আর দুই একজন যারা বাড়ি করেছেন তারা পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যায় রয়েছেন। তাই ভেবেছি যখন এটা বসবাস উপযোগী এলাকা হিসেবে রাজউক গড়ে তুলতে পারবে তখন বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করবো। তার আগে ওখানে হাত দেব না।
দ্বিতীয় পক্ষের মাধ্যমে পূর্বাচলে প্লট কেনা আরেক প্লট মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিজের প্লটে বাড়ি তোলার পরিকল্পনা থাকলেও বিদ্যুৎ সংযোগের অপেক্ষায় কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না থাকায় নির্মাণসামগ্রী পৌঁছানোই এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। এর ওপর রয়েছে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা, দিনদুপুরেও ঘটছে চুরির ঘটনা। রাজউক সব প্রস্তুতি শেষ না করা পর্যন্ত বাড়ি নির্মাণে হাত দেওয়া সম্ভব হবে না। শত শত প্লট মালিক নিজ নিজ জমিতে নির্মাণকাজ শুরু করতে চাইলেও রাজউকের কাজে অগ্রগতি না থাকায় তারা থমকে আছেন। এখানে নেই গ্যাস সংযোগ, নেই সুপেয় পানি, নেই শিশুদের খেলার মাঠও।
প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তদের পাশাপাশি রাজউকের প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্বাচল বাসযোগ্য হয়ে উঠতে না পারার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি মূল কারণ। এরমধ্যে প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ এগিয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। প্রধান কিছু সড়ক তৈরি হলেও প্লট সংলগ্ন সংযোগ সড়কগুলোর অবস্থা এখনো বেহাল। এসবের অনেকটাই এখনো কাঁচা কিংবা ভাঙাচোরা, বর্ষা মৌসুমে যা প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গণপরিবহনের সুযোগ এখানে খুবই সীমিত। এ কারণে যারা ইতোমধ্যে বসবাস শুরু করেছেন, তাদের বেশির ভাগকেই নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর, যা সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

পূর্বাচলের বড় একটি অংশে এখনো নিশ্চিত করা যায়নি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও বিশুদ্ধ পানির সংযোগ। গুটিকয়েক ব্লকে বিদ্যুৎ পৌঁছালেও গ্যাস সংযোগ না থাকায় বাসিন্দারা বাধ্য হচ্ছেন সিলিন্ডার গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে। বিশুদ্ধ পানির জন্যও নিজস্ব গভীর নলকূপ বসাতে হচ্ছে, যা একদিকে যেমন খরচসাপেক্ষ, তেমনি পরিবেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া এখনো গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও। বর্ষায় বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে, বেড়ে যায় মশাবাহিত রোগের শঙ্কা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূরত্বের সমস্যা, ঢাকার প্রাণকেন্দ্র থেকে পূর্বাচলের অবস্থান বেশ দূরে হওয়ায় যাতায়াতও এখানকার বাসিন্দাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
কুড়িল ফ্লাইওভারের মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে পূর্বাচলের যোগাযোগ কিছুটা সহজ হলেও, প্রকল্প এলাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে অনেক সময় প্লট মালিকরা নিজেদের জমিতে যেতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এছাড়া পূর্বাচলে এখনো পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। হাতে গোনা কয়েকটি স্কুল ও কলেজ থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে অনেক অভিভাবককে সন্তানদের ঢাকার মূল শহর বা অন্য দূরবর্তী এলাকায় পাঠাতে হয়, যা তাদের জন্য আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণ। আর এ কারণে এখানে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাইছে রাজউক।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প নিয়ে নগরপরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নাগরিক সেবা নিশ্চিত না হলে প্লট গ্রহীতারা বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হবেন না, এটাই স্বাভাবিক। শুরুতেই নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করে নেওয়া উচিত ছিল রাজউকের। প্লট বিক্রির পরিবর্তে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে বিক্রি করা হলে আবাসন সংকট নিরসনে এই প্রকল্প কিছুটা হলেও ফলপ্রসূ হতে পারত। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে রাজউক শুধু প্লট বরাদ্দ দিয়েই এগিয়েছে। প্রকল্পের নকশা বারবার পরিবর্তনের কারণেই এত দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পূর্বাচল এখনো সম্পূর্ণভাবে বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি, এবং এর দায় রাজউককেই নিতে হবে। পূর্বাচল প্রকল্পের কাজ সর্বোচ্চ ১০ বছরের মধ্যে শেষ করা উচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও প্রকল্পের কাজের তেমন অগ্রগতি নেই।
অন্যদিকে রাজউকের মতে, পূর্বাচল প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন কাজ এগিয়েছে। ১০ কিলোমিটারে কাজ চলছে এবং অবশিষ্ট ৪০ কিলোমিটার সড়ক এখনো প্রাক্কলন পর্যায়ে রয়েছে। কুড়িল ইন্টারচেঞ্জসহ ১৩.৩৩ কিলোমিটার লিংক রোডে আটটি সেতু নির্মাণ শেষ হয়েছে। ৩০০ ফিট প্রশস্ত সংযোগ সড়কটি এখন যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত। এছাড়া প্রকল্পের ৫২টি সেতুর মধ্যে ৪২টির নির্মাণ শেষ হয়েছে, বাকি ১০টি সেতুর কাঠামোগত কাজ আংশিক বাকি রয়েছে। পাশাপাশি, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীর সংরক্ষণের কাজ শেষ হয়েছে। ৪৩ কিলোমিটার লেকের মধ্যে ২৮ কিলোমিটারের উন্নয়ন সম্পন্ন হয়েছে, বাকি ১৫ কিলোমিটারের কাজ এখনও চলমান।
রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের আবাসিক প্লট মোট ২৬ হাজার ২১৩টি। যার মধ্যে তিন কাঠা আয়তনের ১১ হাজার ২০৯টি, পাঁচ কাঠা আয়তনের ১০হাজার ৩৬১টি, ৭.৫ কাঠা আয়তনের দুই হাজার ৬১৮টি, ১০ কাঠা আয়তনের প্লট দুই হাজার ২৫টি। এছাড়া অন্যান্য প্লট আছে তিন হাজার ৫৬৩টি। এর মধ্যে কম-বেশি আয়তনের ১৫টি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, প্রশাসনিক ৪৭২টি, বাণিজ্যিক এক হাজার ৩৩টি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আরবান ফ্যাসিলিটিস প্লট দুই হাজার ৪৩টি। অন্যদিকে, অধিবাসী ও ক্ষতিগ্রস্তদের বরাদ্দ দেওয়া প্লটের সংখ্যা সাত হাজার ৮৬৪টি।
এএসএস/এমএন
