জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই আন্দোলনকে প্রকৃত অর্থে গণজাগরণে রূপ দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি যখন শ্রমজীবী, প্রান্তিক ও সাধারণ নারীরা রাজপথে নেমে এসেছেন, তখনই আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। নারীদের অংশগ্রহণের মধ্যদিয়েই এই আন্দোলন সত্যিকার অর্থে গণচরিত্র লাভ করেছে এবং গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে শ্রমজীবী নারী মৈত্রী আয়োজিত ‘২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান : নারীর অধিকার ও মুক্তির গতিপথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সাইফুল হক বলেন, যে নারী পরিবার ও সমাজের বাধা ভেঙে রাজপথে নেমে আসে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং প্রতিবাদে শামিল হয়, সে আর আগের নারী থাকে না। সে হয়ে ওঠে অধিকার সচেতন, সংগ্রামী ও বিদ্রোহী নারী। এই জাগরণই অনেক উগ্রবাদী ও নারী অধিকারবিরোধী গোষ্ঠীর আতঙ্কের কারণ।
তিনি আরও বলেন, নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো রাষ্ট্রকে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্র বলা যায় না। নারীকে বাদ দিয়ে সমাজ এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা একবিংশ শতাব্দীতে অবাস্তব।
বক্তব্যের শেষাংশে সাইফুল হক বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে নারী-পুরুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লড়াই রাজপথ এবং সমাজ দুই জায়গাতেই অব্যাহত রাখতে হবে।
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বলেন, আন্দোলনে নারীদের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করা হলেও রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের এখনও উপেক্ষা করা। আন্দোলনের সময় নারীদের অংশগ্রহণের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে নারীদের আর দেখা যায় না। নারী মানুষ হিসেবে যে মর্যাদা ও অধিকার প্রাপ্য, সেটাই তারা চায়। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সেই মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি।
সীমা দত্ত আরও বলেন, আন্দোলনের পর নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বেড়েছে। নারী সংস্কার কমিশনকে ঘিরে অপমানজনক বক্তব্য দেওয়া হলেও এ বিষয়ে রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, নারীকে কেবল প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা হয়, কিন্তু নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাকে জায়গা দেওয়া হয় না। সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে নারীরা সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে যেতে চাইলেও অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সে বিষয়ে আন্তরিক নয়।
নারীর নিরাপত্তা ও বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি আলোচিত ঘটনার বিচার হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেশের প্রতিটি নারী যেন সমানভাবে ন্যায়বিচার পায়, সেটি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণ, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন জরুরি।
সীমা দত্ত আরও বলেন, নারীর চলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে কেবল আইন করে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই নারীদের নিজেদেরও সংগঠিত হতে হবে এবং অধিকার আদায়ে আরও সোচ্চার হতে হবে।
আলোচনা সভার সভাপতির বক্তব্যে শ্রমজীবী নারী নেত্রী সভাপতি বহ্নিশিখা জামালী বলেন, সমাজের মুক্তি ছাড়া নারীর প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, আমাদের সমাজ এখনো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নারীকে এখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখা হয় না। অথচ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
আলোচনা সভায় তিনি আরও বলেন, নারী ও পুরুষকে আলাদা পরিচয়ে নয়, মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুললেই প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
এসএএ/জেআই
