সেলুনে কাজ করছিলেন শিমুল শীল (৪৫)। হঠাৎ ভাতিজার ফোন পেয়ে সেলুনের ১০০ মিটার দূরে গিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। দেখতে পান, সড়কের ওপর পড়ে আছে স্ত্রী ইফা শীলের (৩৫) মরদেহ।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজারের টানেল মোড়ে কোরিয়ান ইপিজেডের (কেইপিজেড) একটি শ্রমিকবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারায়। বাসটি সামনে থাকা পাঁচটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই নারী শ্রমিক নিহত ও অন্তত ২০ জন আহত হন। এ ছাড়া এক গর্ভবতী নারীর পেটের সাত মাসের অনাগত শিশুও মারা যায়। নিহত ব্যক্তিরা সবাই সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) দুপুরে উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় শ্মশানে ইফা শীলের মরদেহ সৎকার করা হচ্ছে। চারদিকে চলছে শোকের মাতম। ধর্মীয় প্রার্থনা আর শেষকৃত্যের আয়োজনে শ্মশানে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। পুত্রসন্তান না থাকায় স্বামী শিমুল শীল নিজেই স্ত্রীর মুখাগ্নির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেখানে উপস্থিত সবার মুখে একটাই আলোচনা, আজ ঝিওরী গ্রামের সবচেয়ে শোকের দিন। এ গ্রামেই ঝরে গেছে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো দুই নারী ও এক গর্ভের সাত মাসের শিশুর প্রাণ।
নিহত ইফা শীলের স্বামী শিমুল শীল বলেন, আমার আদি বাড়ি বাঁশখালী। ২৫ বছর আগে মা ও তিন ভাই মিলে এখানে বসবাস শুরু করি। ২০ বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়। চরম আর্থিক অনটনের কারণে এখনো আমাদের ভাড়া বাসায় থাকতে হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, সেলুনে কাজ করে আর কত টাকাই বা আয় করি! আমার স্ত্রী ইফা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কেইপিজেডে চাকরি করে আসছিল। তার আয়ের ওপর ভরসা করে এবং পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মাত্র চার মাস আগে বড় মেয়ে নন্দিতা শীলের বিয়ে দিয়েছি। আমাদের ছোট মেয়ে রাধিকা শীলের বয়স এখনো মাত্র সাত বছর। সে এখনো জানেই না যে তার মা আর বেঁচে নেই। আমাদের কোনো ছেলেসন্তানও নেই। এমন আকস্মিক ঘটনায় আমি আজ সম্পূর্ণ কূলহারা হয়ে গেলাম।
এদিকে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলায় ব্যস্ত ছিল সাত বছরের রাধিকা শীল। অবুঝ শিশুটি এখনো মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেনি। সরল মনে সে বলে, মা অফিস থেকে ফেরার সময় আমার জন্য নাস্তা নিয়ে আসবেন, আমি সেই নাস্তা খাব।
ঘটনার বিষয়ে আনোয়ারা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মজনু মিয়া জানান, কেইপিজেডের শ্রমিকবাহী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অটোরিকশা ও রিকশাকে ধাক্কা দিলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
/এমএসএ
