দেশে মাদকের বিস্তার রুখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের সর্বগ্রাসী থাবা থেকে বাঁচাতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। অভিযান-নির্ভর নীতি থেকে সরে এসে সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সামাজিক অংশগ্রহণ- এই পাঁচ ধরনের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নতুন কৌশল সাজানো হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, মাদকবিরোধী কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার অধীনে ২ হাজার প্রশিক্ষক বা মেন্টর তৈরি করা হবে। পাশাপাশি ২০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গঠন করা হবে মাদকবিরোধী কমিটি, যা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে উঠবে।
আরও পড়ুন
এ ছাড়া মাদকের সরবরাহ বন্ধ ও সীমান্তে নজরদারি জোরদারে ১০০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন, সারা দেশে ৩৫ হাজার অভিযান পরিচালনা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ডোপ টেস্ট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযানের স্বচ্ছতা ও সক্ষমতা বাড়াতে কেনা হচ্ছে ৩০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং গড়ে তোলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের ন্যাশনাল টার্গেটিং সেন্টার (এনটিসি)। মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সীমান্ত এলাকায় বহুমুখী নজরদারির মাধ্যমে মাদকের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং একটি টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
অবৈধ মাদক প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ১০০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে ৩৫ হাজার সাধারণ অভিযান এবং ৬০ দিনের একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে ২০০টি নির্ধারিত টার্গেটে হানা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যা মাদক চক্রের নেটওয়ার্ক দুর্বল করে সরবরাহ কমিয়ে আনবে
ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, জনসচেতনতা বাড়াতে দেশের সব বিভাগ ও জেলায় কর্মশালা এবং সাধারণ মানুষের সরাসরি মতামত নেওয়ার জন্য গণশুনানি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয়দের মাদক প্রতিরোধে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হবে।

পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে জেলা, উপজেলা ও মহানগরের থানাভিত্তিক অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত ও হালনাগাদের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে মাদক মামলার তদন্ত ও অপরাধী শনাক্ত করা সহজ হবে।
অবৈধ মাদক প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ১০০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে ৩৫ হাজার সাধারণ অভিযান এবং ৬০ দিনের একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে ২০০টি নির্ধারিত টার্গেটে হানা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যা মাদক চক্রের নেটওয়ার্ক দুর্বল করে সরবরাহ কমিয়ে আনবে।

মাদকের আর্থিক উৎস ও অর্থপাচার শনাক্ত করতে ৫০ জন কর্মকর্তাকে মানি লন্ডারিং বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একইসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালে স্ক্রিনিং ডোপ টেস্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা পরবর্তীতে ময়মনসিংহ, রংপুর ও খুলনা বিভাগেও সম্প্রসারণ করা হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০টি ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে গবেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং কলাম লেখক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাদকবিরোধী লড়াই শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান দিয়ে সফল হবে না। একইসঙ্গে প্রতিরোধ, সচেতনতা, গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে মাদক নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বডি ক্যামেরা ও আধুনিক সরঞ্জাম ক্রয়
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০টি ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অভিযানের প্রমাণ সংরক্ষণ সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে।
আরও পড়ুন
পাশাপাশি, আভিযানিক সক্ষমতা জোরদারে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি নতুন যানবাহন এবং কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০টি ‘শর্ট রেঞ্জ’ অস্ত্র কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (আইএনসিবি) জিআরআইডিএস কর্মসূচির আওতায় দেশে একটি ‘ন্যাশনাল টার্গেটিং সেন্টার’ (এনটিসি) স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় আরও শক্তিশালী করবে।
জেলা-উপজেলায় মাদকবিরোধী ব্রিগেড
সূত্র জানিয়েছে, তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ‘মাদকবিরোধী ব্রিগেড’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব ব্রিগেডে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক ক্লাবকে যুক্ত করা হবে।

শিক্ষা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত এসব পরিকল্পনা দেশে মাদক সরবরাহ বন্ধ এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অধ্যাপক, লেখক, গবেষক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ড. মো. সহিদুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, মাদক একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সংকট। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানবাধিকার- সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে কেবল অভিযান বাড়ালেই হবে না। প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী মেন্টর তৈরি ও কমিটি গঠনের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে এসব কর্মসূচি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মাদক কারবারিদের অর্থের উৎস শনাক্ত, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর অভিযান এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে মাদক চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। একইসঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অর্থের উৎস শনাক্তকরণ এবং সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মাদক চোরাচালান ও মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, মাদক সিন্ডিকেট এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে অভিযানের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা ১২০ দিনের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছি। আরও বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা এগোচ্ছি। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আমাদের লক্ষ্য শুধু মাদক উদ্ধার নয় বরং মাদক সিন্ডিকেটের অর্থায়ন ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
মহাপরিচালক বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মাদকবিরোধী মেন্টর তৈরি, কমিটি গঠন, মাদক কারবারিদের হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে মাদকের সরবরাহ ও চোরাচালান উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এমএম/এমএম/
