বিজ্ঞাপন

বোমা পাওয়ার পরও নিরাপত্তায় ঢিলেমি, ব্যাগ-বস্তা নিয়ে মেট্রোরেলে যাত্রীরা

বোমা পাওয়ার পরও নিরাপত্তায় ঢিলেমি, ব্যাগ-বস্তা নিয়ে মেট্রোরেলে যাত্রীরা

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মতিঝিল স্টেশনের নিচে শক্তিশালী আইইডি বোমা ফেলে রাখা এবং মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট স্টেশনে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত বস্তাকে ঘিরে বোমাতঙ্কের পর নিরাপত্তা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিপরীতে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের তরফে যাত্রী-নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ কোনো উদ্যোগ বা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

উল্টো দেখা গেছে, বিভিন্ন স্টেশনে বড় বড় ব্যাগ, বস্তা ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করছেন। প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাগ বা মালামাল তল্লাশি করা হচ্ছে না। এতে যাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে।

dhakapost

সোমবার (৩ আগস্ট) সরেজমিনে ফার্মগেট, আগারগাঁও ও মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, যাত্রীরা কাঁধে, হাতে কিংবা ট্রলিতে বড় বড় ব্যাগ ও বস্তা নিয়ে স্টেশনে প্রবেশ করছেন। প্রবেশপথে আনসার সদস্য ও এমআরটি পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও তারা কোনো ধরনের তল্লাশি বা ব্যাগ পরীক্ষা করছেন না।

এ বিষয়ে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন আনসার ও এমআরটি পুলিশের সদস্যের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, সন্দেহজনক কিছু মনে না হলে সাধারণত কাউকে তল্লাশি করা হয় না। তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াত করেন। প্রত্যেক যাত্রীর ব্যাগ পরীক্ষা করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং এতে যাত্রীদের ভোগান্তি তৈরি হবে। তাদের মতে, বিমানবন্দরের মতো পৃথক নিরাপত্তা অবকাঠামো, পর্যাপ্ত স্ক্যানিং ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় জনবল থাকলে শতভাগ তল্লাশি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

dhakapost

নিরাপত্তাকর্মীরা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিলেও যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে।

মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন একজন ঢাকার মিরপুরের বসিন্দা মো. সেলিম। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, মেট্রোরেলে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। এক জায়গায় বোমা পাওয়া গেছে, অন্য জায়গায় বোমার আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এতে তো আমরা ভয়ে আছি, কখন কী হয়ে যায়। যদি সত্যি সত্যি বোমা হামলা হয় তাহলে কত মানুষের প্রাণহানি হতে পারে তা তো চিন্তারও বাইরে।

dhakapost

তিনি বলেন, আমি চাই সরকার এটাতে আরও গুরুত্ব দিক। আমরা নিরাপদে চলাচল করতে চাই।

তুলি আক্তার নামে এক যাত্রী বলেন, আমরা যারা নিয়মিত মেট্রোরেলে যাতায়াত করি তাদের জন্য বিষয়টি তো অবশ্যই আতঙ্কের। শেষের কয়েকটা দিন দেখছি মেট্রোরেলের গতিও কমে গেছে। এর কারণ কী আমরা জানি না। যদি নিরাপত্তা ইস্যু হয় তাহলে সরকার যেন এদিকে একটু বাড়তি নজর দেয়। আগে তো জনগণের নিরাপত্তা, তারপর অন্যকিছু।

জানতে চাইলে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের এমআরটি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুশফিকুর রহমান বলেন, মেট্রো স্টেশনে আমরা ডিউটিরত অবস্থায় সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে চেক করা হয় এছাড়া সাধারণত চেক করা হয় না। আমাদের এখানে হ্যান্ড ডিটেক্টর ছাড়া অন্য কোনো নিরাপত্তা স্ক্যানিং মেশিন বা ডিটেক্টর নেই। তাই নিয়মিত চেক করা হয় না।

dhakapost

সচিবালয় মেট্রো স্টেশনের দায়িত্বে থাকা এমআরটি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) জানান, আমাদের ঊর্ধ্বতন ও কর্মকর্তাসহ নিরাপত্তার বিষয়ে মিটিং হয়েছে। আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সন্দেহভাজন কোনো কিছু দেখলে তল্লাশি করতে হবে। এখানে আরও নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের বিষয়টিও জানানো হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এখানে সিকিউরিটির জন্য আর্চওয়ে থাকলেও সেগুলো কার্যকর ছিল না। নতুন করে সেগুলোকে সেটআপ করা হচ্ছে। একটি স্ক্যানার মেশিনও এখানে আছে, তবে সেটি এখন কাজ করছে না।

ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের স্টেশন কন্ট্রোলার উজ্জ্বল আলী বলেন, আসলে আমরা নিরাপত্তার বিষয়টি সরাসরি দেখি না। এজন্য এমআরটি পুলিশ, আনসার সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। আমাদের কাজ মূলত সিসি ক্যামেরা এবং যান্ত্রিক ব্যবস্থা মনিটরিং করা।

dhakapost

বোমা সন্দেহ তৈরি করা ব্যাগ পাওয়ার স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেখানে ব্যাগটি রাখা হয়েছিল, সেখানে আমাদের কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। তবে সিঁড়িতে ওঠা ও নামার পথসহ ওপর ও নিচের দুই ফ্লোরে ক্যামেরা বসানো আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, সন্দেহজনক ব্যাগ বা বস্তাতে কোনো বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যায়নি। এগুলো কে বা কারা রেখেছে তা শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজসহ সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া আইইডির সঙ্গে শনিবারের ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, মিরপুর-১০ স্টেশনে পান-জর্দার কৌটাসহ কিছু সাধারণ বস্তু পাওয়া গেছে, আর ফার্মগেটে পাওয়া বস্তায় ছিল আবর্জনা। সেখানে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তাই এ মুহূর্তে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

dhakapost

মেট্রো স্টেশনে নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে ডিএমটিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলমকে মুঠোফোনে একাধিক বার কল দিলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি বিএমডব্লিউ ছাতার ভেতর থেকে প্রায় ১.৫ কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এবং টাইমিং নিয়ন্ত্রিত একটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট। পরে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। এতে এক পথচারী আহত হন।

dhakapost

৬ দিন পর, গত ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ার একটি মুদি দোকানে ট্রাভেল ব্যাগের ভেতরে প্রেসার কুকারে একটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বোমাটি টাইমারযুক্ত ছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।

এরপর গত ১ আগস্ট ফার্মগেট ও মিরপুরে মেট্রোরেল স্টেশনে পরিত্যক্ত বস্তার মধ্যে বোমা থাকার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সেগুলোতে কিছু পাওয়া যায়নি।

এসএএ/এমএন

বিজ্ঞাপন