কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী ৬৯৮ জন বাংলাদেশি কর্মীকে প্রস্তুত করা হয়েছে। ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষিত এসব কর্মীদের ইতালি পাঠাতে চায় সরকার। শিগগরিই তাদের ইতালির বিভিন্ন সেক্টরে কাজে লাগাতে দেশটিকে অনুরোধ করবে বাংলাদেশ।
রোমের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) তৃতীয় দফার রাজনৈতিক পরামর্শক সভায় বসছে বাংলাদেশ ও ইতালি। সভায় বিশেষ গুরত্ব পাবে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন ইস্যু। এক্ষেত্রে অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের আওতায় প্রস্তুত বাংলাদেশি কর্মীদের নেওয়ার বিষয়টি তুলবে ঢাকা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সভায় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। অন্যদিকে, ইতালির পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক মহাসচিব রিকার্ডো গুয়ারিলিয়া নেতৃত্ব দেবেন। সভায় দুই দেশের সম্পর্কের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সভায় নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ইতালির পক্ষ থেকে অবৈধ অভিবাসন কমানোর বিষয়ে জোর দেওয়ার কথা বলা হবে। আর বাংলাদেশ অবৈধ অভিবাসন কমাতে ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের আওতায় আওতায় প্রস্তুত বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ, ইতালিগামীদের ভিসা সমস্যার সুরাহা ও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা জটিলতা দূর করার মতো বিষয়গুলো উত্থাপন করবে।
এছাড়া রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ইতালির ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ আমদানি, অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ)-এর অগ্রগতি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার ইস্যু, ইন্দো-প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্যসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, অভিবাসন সবচেয়ে বড় ইস্যু। ইইউর ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পে ইতালিও অংশীদার। যেহেতু ইতালি এই প্রকল্পের অংশীদার তাই তাদের বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার জন্য বলা হবে। আমাদের প্রায় ৭০০ জন কর্মী প্রস্তুত রয়েছেন। আমরা মনে করি, বৈধ পথে লোক যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে আমাদের অবৈধ অভিবাসন কমে আসবে। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অভিবাসী ইতালি ঢুকে। তারা এটা বন্ধ করতে চায়। সেজন্য আমাদের সহযোগিতা চায়।
এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ইতালি ভিসা দেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর কিন্তু ইতালি অবৈধ বাংলাদেশি প্রবেশের পরিমাণ কমেছে। ব্যাকলগ সমস্যা অনেকটাই কমে আসছে। সভায় বাংলাদেশ ব্যাকলগ ইস্যুটাও তুলবে। আরেকটা গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ইতালিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করছে, কিন্তু ভিসা পাওয়ার পরিমাণ অনেক কম। মূলত, অবৈধ অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই ঝামেলাটা হয়েছে। গত বছর ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সফরের কথা ছিল, যদিও পরে সেটি স্থগিত করা হয়। তার সফরকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু শিক্ষার্থী ভিসা দিযেছিল তারা, এখন আবার পরিমাণ কম; এটা আমাদের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী ৬৯৮ জন কর্মী আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ কর্তৃক চূড়ান্তভাবে যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তারা মোট ৮টি প্রধান ট্রেডে ইউরোপের বাজারে, বিশেষ করে ইতালিতে প্রেরণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কর্মীদের ইতালির বিভিন্ন সেক্টরে কাজের জন্য প্রেরণের লক্ষ্যে ইতালীয় দূতাবাসের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং অনেকেই বর্তমানে ইন্টারভিউর জন্য অপেক্ষমান আছেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ৩০ লাখ ইউরোর ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ২০২৪-২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা।
‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্প চালুর সময়ে বলা হয়েছিল, এটি শ্রমিকদের দক্ষতার ঘাটতি মোকাবিলা করবে, অভিবাসন খরচ কমাবে, বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসনে ইচ্ছুক জনগোষ্ঠীর জন্য সুযোগ বাড়াবে, যাতে ইইউ শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ কর্মী সরবরাহ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো এই প্রকল্পের মাধ্যমে কোনো কর্মীর কর্মসংস্থান হয়নি।

সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধ পথে ইতালি প্রেরণের পরিকল্পনা হিসেবে দেশটি থেকে কারিগরি প্রশিক্ষক আনার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করছে।
বাংলাদেশ-ইতালির রাজনৈতিক পরামর্শক সভায় বিনিয়োগ ইস্যুতে জোর থাকবে জানিয়ে সরকারের আরেক কর্মকর্তা বলেন, সভায় বিনিয়োগের বিষয়টিতেও গুরত্ব দেওয়া হবে। বাংলাদেশে ইতালির যে চেম্বার অব কর্মার্স রয়েছে-এটাকে নতুন করে সাজাতে চাইছে দেশটি। আমরাও রাজি, প্রক্রিয়া চলমান। এ ছাড়া, ইইউ বাংলাদেশে একটা বিজনেস ফোরাম করবে; এটাও নিয়েও সভায় আলোচনা হবে।
এনআই/এমটিআই
