বিজ্ঞাপন

অকাতরে অনেকে দিয়েছেন প্রাণ

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল রিকশাচালক-হকার আর শ্রমিক

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল রিকশাচালক-হকার আর শ্রমিক

জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে রিকশাচালক, হকার, শ্রমিক, দিনমজুর, পরিবহনকর্মীসহ খেটে খাওয়া মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে। তাদের অংশগ্রহণেই একটি পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রূপ নেয় আপামর জনতার গণঅভ্যুত্থানে।

আন্দোলনের দিনগুলোতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় থাকা রিকশাচালকরাই একসময় হয়ে ওঠেন আন্দোলনের সহযোগী। কেউ শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, কেউ আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন, আবার কেউ নিজের অবস্থান থেকে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এসব দৃশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা ও সমর্থন আরও বাড়িয়ে দেয়।

২০২৪ সালের ২ আগস্ট (শুক্রবার) রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর এলাকায় রিকশাচালক সুজনের একটি দৃশ্য ব্যাপক আলোচনায় আসে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মিছিল ওই এলাকা অতিক্রম করার সময় মোহাম্মদ সুজন নামের এক রিকশাচালক রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে স্যালুট জানান। দীর্ঘ সময় হাত তুলে রাখা সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের কাছে এটি হয়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সম্মান ও সংহতির প্রতীক।

শুধু ব্যক্তিগত সমর্থন নয়, রিকশাচালকদের সংগঠিত অংশগ্রহণও তখন নজরে আসে। আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারা ব্যানার ও স্লোগান নিয়ে রাজপথে নামেন। তাদের অনেকের বক্তব্য ছিল, শিক্ষার্থীদের দাবি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, এটি সাধারণ মানুষেরও দাবি। ফলে আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত হয়।

অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচিকে ঘিরেও রাজধানীতে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়। আগস্টের ৪ তারিখ রিকশাচালকদের একটি মিছিল গুলিস্তান এলাকা থেকে শুরু হয়ে পল্টন, জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া রিকশাচালকেরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। পথ চলতি মানুষ ও যাত্রীদের অনেকেও তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

একই সময়ে বিভিন্ন পেশার মানুষও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, কৃষিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের অবস্থান ও মিছিল আন্দোলনের ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার চিত্র তুলে ধরে।

জুলাই আন্দোলনে হকারদের মধ্যেও দেখা যায় একই ধরনের সংহতি। সে সময় এক হকারের বক্তব্য ব্যাপক আলোচিত হয় — ‘ছাত্ররা কি আমাগো ভাই-ব্রাদার না?’ তার এই প্রশ্নে ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের আবেগ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের সম্পর্কের অনুভূতি। বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের সময় সাধারণ মানুষের অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

রাজপথে শুধু সংহতি নয়, প্রাণও দিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষ

জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল যেমন দৃশ্যমান, তেমনি ছিল তাদের আত্মত্যাগও। আন্দোলনের দিনগুলোতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান বহু রিকশাচালক, দিনমজুর, শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষ। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় থাকা এসব মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই আন্দোলনের সরাসরি অংশ ছিলেন না, কিন্তু সংঘাতের মধ্যে পড়ে হারিয়েছেন জীবন। তাদের মৃত্যু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বেদনাময় অধ্যায়ের অংশ হয়ে আছে।

১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরা এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন রিকশাচালক ইসমাইল। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে রামপুরার ডেল্টা হেলথ কেয়ার হাসপাতালের সামনে নেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি। পরে হাসপাতালের সিঁড়িতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়। তার নিথর দেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

একই দিনে রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় নিহত হন রিকশাচালক কামাল মিয়া। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের ছেলের মাদ্রাসায় খাবার দিতে যাওয়ার সময় তিনি গুলির শিকার হন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন কামাল মিয়া।

এর আগে ১৮ জুলাই নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় আন্দোলন চলাকালে মাথায় একাধিক গুলিবিদ্ধ হন রিকশাচালক আইনুদ্দিন। দীর্ঘদিন ধরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এই শ্রমজীবী মানুষটি গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এ ছাড়া ১৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন ও শান্তিনগর এলাকায় সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে আরও একজন রিকশাচালক নিহত হওয়ার ঘটনা সামনে আসে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহিদদের একটি বড় অংশ ছিলেন শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, পোশাকশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিকসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন।

প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গেজেটভুক্ত শহিদদের তালিকা বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই বিশ্লেষণে বলা হয়, শহিদদের প্রায় ৩৫ শতাংশ ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যেও শ্রমজীবী মানুষের বড় অংশের মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে। তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল শ্রমিকদের। ম্যানুয়াল ও শিল্প খাতে কাজ করা শত শত শ্রমিক এই আন্দোলনে নিহত হন। এর সঙ্গে হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের যুক্ত করলে শ্রমজীবী মানুষের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও শ্রম অধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনে তিন শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ শহিদ হয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) প্রাথমিক তথ্যেও আন্দোলনের সময় নিহত শ্রমিকদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে বিভিন্ন খাতের শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যুর তথ্য উঠে আসে।

প্রত্যাশার বাংলাদেশ এখনো অধরা : স্যালুট সুজন

জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত মুখ রিকশাচালক মোহাম্মদ সুজন, যিনি ‘স্যালুট সুজন’ নামে পরিচিত। তিনি বলছেন, যে প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সুজন বলেন, ওই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না। এটি ছিল সাধারণ মানুষের আন্দোলন। দেশের মানুষ একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। সেই চেতনা ধরে রেখেই সবাইকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তবে আন্দোলনের পরও মানুষের প্রত্যাশার সবটুকু পূরণ হয়নি বলে মনে করেন সুজন। তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখনো নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।

জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন থেকেই যাবে। বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

সুজনের দাবি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, মানুষের নিরাপত্তা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই ছিল জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরএইচটি/এমটিআই