দুই বছর আগে জুলাইয়ের আন্দোলনে মাথায় গুলি লেগেছিল সাত বছরের শিশু মো. বাছিত খান মুসার। সেই গুলি তার মাথা ভেদ করে প্রাণ কেড়ে নেয় দাদির। এরপর থেকে হাসপাতালের বিছানাই যেন তার জীবনের স্থায়ী ঠিকানা। একের পর এক অস্ত্রোপচার, আইসিইউ, বিদেশে চিকিৎসা, সবকিছু পেরিয়ে দেশে ফিরলেও এখন তার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নথিপত্রের জটিলতা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের দীর্ঘসূত্রতায় থমকে আছে পরবর্তী ফলোআপ।
ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে মুসার বাবা মো. মোস্তাফিজুর রহমান ফিরে যান ২০২৪ সালের ২০ জুলাইয়ের সেই বিকেলে। তিনি বলেন, বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় আন্দোলন ও গোলাগুলির মধ্যে বাসার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল মুসা। হঠাৎ একটি বুলেট এসে তার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। একই বুলেট গিয়ে লাগে পাশে থাকা দাদির পেটে। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।
এরপর শুরু হয় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো। প্রথমে ফরাজী হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় মুসাকে। সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, পরদিন ভোরে অ্যাম্বুলেন্সে আমার মায়ের মরদেহ ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছিল। কিন্তু আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা ছেলেকে রেখে যেতে পারিনি। শেষবারের মতো মায়ের মুখও দেখতে পারিনি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে সেদিন রাতেই গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করতে হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ১২টি অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের পরামর্শে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট মুসাকে ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত প্রায় ৬০টি অস্ত্রোপচার করা হয়।
মুসার বাবা বলেন, প্রতি সপ্তাহেই অপারেশন হচ্ছিল। কিন্তু বারবার ক্ষতস্থান পচে যাচ্ছিল, পুঁজ ও পানি জমছিল। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, এভাবে আর সম্ভব নয়; সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিদেশে নেওয়াই একমাত্র উপায়।
পরে দুটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে ওই বছরের ২২ অক্টোবর মুসাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত একাধিক অস্ত্রোপচার করা হয়। দীর্ঘ সময় আইসিইউতে থাকার পর সংক্রমণমুক্ত কেবিনে স্থানান্তর করা হয় তাকে। এরপর গত বছরের এপ্রিলে দেশে ফেরানো হয়। চিকিৎসকেরা নিয়মিত ফলোআপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচিও দিয়ে দেন। কিন্তু দেশে ফেরার পরই নতুন এক সংকটে পড়ে পরিবার।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আজ সাত মাস হয়ে গেল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করতে পারছি না। সিঙ্গাপুর থেকে দেওয়া অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ভিসা দুবার বাতিল হয়ে গেছে। তৃতীয়বারও যদি সময়মতো যেতে না পারি, তাহলে চিকিৎসকেরা আর আমাদের নতুন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেবেন না।
তিনি জানান, সিঙ্গাপুর থেকে যে বিশেষ দুধ ও খাবার দেওয়া হয়েছিল, তা ছয় মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সাধারণ খাবার বা ওষুধ মুসার শরীর গ্রহণ করতে পারছে না। যা-ই খাওয়াই, বমি করে ফেলে দেয়। শুধু পুষ্টির অভাবে গত ছয় মাসে ওর ওজন প্রায় ছয় কেজি কমে গেছে।
মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় দুই বছর এক মাস ধরে মুসা মুখ দিয়ে কোনো খাবার খেতে পারে না। নাকের নলের মাধ্যমে তরল খাবার দেওয়া হয়। শরীরের ডান পাশ প্রায় অচল। মাথায় কৃত্রিম খুলি নিয়েই বেঁচে আছে ছোট্ট শিশুটি।
কথার একপর্যায়ে রাষ্ট্রের প্রতি নিজের অসহায় আবেদন জানান তিনি।
সরকার যদি ওর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে আমাদের পরিষ্কার করে বলুক। আমরা এনজিও বা অন্য কারও কাছে সাহায্য চাইব। কিন্তু সামান্য কিছু কাগজপত্রের জন্য একটি শিশুর জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখবেন না। আমার ছেলেটা বাঁচতে চায়। ওকে বাঁচানোর দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নয়? বলতে বলতেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে মুসার বাবা মোস্তাফিজের।
এমএল/এমএসএ
