বিজ্ঞাপন

গণভবন এখন জুলাই জাদুঘর, ৫০ টাকার টিকিটে ইতিহাস দেখার সুযোগ

গণভবন এখন জুলাই জাদুঘর, ৫০ টাকার টিকিটে ইতিহাস দেখার সুযোগ

একসময় দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল গণভবন। সাধারণ মানুষের প্রবেশ ছিল একেবারেই সীমিত। সেই গণভবনই এখন রূপ নিয়েছে ‘জুলাই জাদুঘরে’। ৫০ টাকার টিকিট কেটে দেশের সাধারণ মানুষ এখন প্রবেশ করতে পারছেন ভবনটিতে, ঘুরে দেখছেন বিভিন্ন গ্যালারি, ঐতিহাসিক দলিল, আলোকচিত্র ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট নানা স্মারক।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সরজমিনে যায়, প্রবেশপথ পেরিয়ে দর্শনার্থীরা একে একে বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে দেখছেন। সকাল থেকে বৃষ্টি হলেও বিকেলে বৃষ্টি কমার পর দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়ে যায়। প্রথম দিনেই জুলাই জাদুঘরে মানুষের ঢল নামে। জাদুঘরের ভেতরে সংরক্ষণ করা হয় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত বেডরুম, ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রী, লাল রঙের টেলিফোন, যেখানে বসে তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ করতেন বলে দর্শনার্থীদের জানানো হচ্ছে। অনেককে এসব স্থানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে এবং আগ্রহ নিয়ে তথ্য পড়তে দেখা যায়।

কুমিল্লা থেকে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী খাদিজা খানম বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাগুলো নিয়ে অনেক কিছু শুনেছি। এখানে এসে বিভিন্ন ছবি, তথ্য ও প্রদর্শনী দেখে বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে শেখ হাসিনা তাদের পেটুয়া বাহিনী ও পালিত পুলিশ দিয়ে যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছে সে সব ডকুমেন্টারি তথ্যচিত্র এখানে দেখতে পেলাম। কীভাবে মানুষকে খুন ও গুমের নির্দেশ দিত, কীভাবে মানুষকে গুম করে আয়না ঘরে রাখত সেসব চিত্র এখানে দেখতে পেলাম।

ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী সামিউল বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার প্র্যাকটিক্যাল শেষ করেই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে জাদুঘর দেখতে এসেছি। শুরুতে ৫০ টাকার প্রবেশমূল্য কিছুটা বেশি মনে হলেও পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখার পর সেটিকে যৌক্তিক বলেই মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, জাদুঘরে এসে আয়নাঘরসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নতুন অনেক তথ্য জানতে পেরেছি। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন ও বিভিন্ন নিদর্শন দেখে সেই সময়ের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছি।

সামিউল বলেন, আমাদের রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ ভাইও জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। জাদুঘরে তার স্মৃতিচিহ্ন দেখে খুব খারাপ লেগেছে। এখন অনেকেই জুলাইয়ের ঘটনাগুলো ভুলতে শুরু করেছে। কিন্তু এ জাদুঘরে এলে বোঝা যায়, কত মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা আজকের বাংলাদেশ পেয়েছি। তাই সবার এখানে এসে সেই ইতিহাস জানা ও মনে রাখা উচিত।

জাদুঘরের ভেতরে ঘুরে দেখা যায়, শেখ হাসিনার ব্যবহৃত বলে প্রদর্শিত লাল টেলিফোনটি ঘিরে দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ। অনেকেই টেলিফোনটির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, আবার কেউ কেউ কৌতূহলবশত রিসিভার হাতে নিয়ে প্রতীকীভাবে কথা বলার ভঙ্গি করছেন। এ সময় কয়েকজন দর্শনার্থীকে হাস্যরসের ছলে বলতে শোনা যায়, “আপা, দেশে কবে আসবেন, বিমানবন্দরে আপনাকে রিসিভ করার জন্য অপেক্ষায় আছি। আপনি আসলে দেখতে পারবেন আপনার গণভবন এখন জুলাই জাদুঘর হয়ে গেছে'' যা আশপাশের উপস্থিত দর্শনার্থীদের মধ্যেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবনে সাধারণ জনতা ঢুকে পড়ার এবং লুটপাট করার বিভিন্ন ছবি এখানে জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে। রয়েছে জুলাই আগস্টে নিহত সকলের প্রতীকী, কবর স্থান।

রাজধানীর উত্তরা থেকে মমিন নামের একজন জুলাই জাদুঘর ঘুরে দেখে অভিযোগ করে বলেন, যেহেতু এটার নাম হয়েছে জুলাই জাদুঘর, তাই শুধু জুলাই-আগস্টে যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোই রাখলে ভালো হতো। জাদুঘরের ভেতরে জুলাই আন্দোলন ছাড়াও পিলখানা হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞের চিত্রও এখানে তুলে ধরা হয়েছে, সঙ্গে রয়েছে ‍র‍্যাবের টর্চার ও আয়না ঘর। তিনি দাবি করেন এখানে ৫ আগস্টে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলো সেভাবে রাখলেই ভালো হতো।

জাদুঘরের একটি অংশে রয়েছে আলোচিত 'আয়না ঘর' সংক্রান্ত তথ্য ও উপস্থাপনা। এছাড়া পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন আলোকচিত্র, তথ্যচিত্র ও নথি প্রদর্শন করা হয়। পৃথক গ্যালারিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, পোশাক, আলোকচিত্র, ব্যানার, হেলমেট এবং আন্দোলনের বিভিন্ন উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়, যা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

এছাড়া বিভিন্ন গ্যালারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র, দলিল-নথি এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়। এসব প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে দেখা যায়।

দর্শনার্থীদের অনেকেই জানান, জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে প্রদর্শিত তথ্য ও নিদর্শন দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানার সুযোগ করে দিচ্ছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে আরও তথ্য ও প্রদর্শনী যুক্ত করা হলে জাদুঘরটি ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

এসএএ/আরএফ