বিজ্ঞাপন

বন্যায় ভেসে গেছে ঘর, সরকারের কাছে মাথা গোঁজার ঠাঁই চান নিঃস্ব শাহানুর

বন্যায় ভেসে গেছে ঘর, সরকারের কাছে মাথা গোঁজার ঠাঁই চান নিঃস্ব শাহানুর

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শাহানুর আক্তার (৪৬)। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি কেবলই হারিয়েছেন। আজ তিনি কেবল ভিটেমাটিহারা এক নিঃস্ব নারী নয়, আপনজনদের অবহেলা, অবজ্ঞা আর সামাজিক প্রতিকূলতায় বিপর্যস্ত এক জীবন। জীবনের শেষ বেলায় দাঁড়িয়ে সরকারি সহায়তায় মাথা গোঁজার সামান্য একটু আশ্রয় চান এই গৃহহীন নারী।

শাহানুরের জীবনের গল্পটি অন্য অনেক সাধারণ নারীর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তার বাপের বাড়ির এলাকায় ভাড়া থাকতেন রবিউল হক নামের কুমিল্লার বাসিন্দা। তিনি পেশায় ছিলেন এক রাজমিস্ত্রি। সেই সুবাদে রবিউলের সঙ্গে শাহানুরের পরিবারের পরিচয় হয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের সম্মতিতে, তার চাচার উদ্যোগে রবিউলের সঙ্গে বিয়ে হয় এই নারীর।

সংসার জীবনে শাহানুরের কোলজুড়ে আসে তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও বাকি দুই মেয়ে ও এক ছেলে থাকতো তাদের বাবা রবিউলের সঙ্গেই। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি আবারও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু, পারিবারিক চাপ আর নানা পরিস্থিতির কারণে সেই নতুন সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত তার জীবনে স্থায়ী হয়নি। আজ চারদিকে তিনি কেবল একা। যেন তার আপন বলতে আর কেউ রইল না।

ব্যক্তি জীবনে এই নারীর শুধু সংসার ভাঙেনি, সাম্প্রতিক বন্যায় তার সহায়-সম্বল বলতে যা ছিল, তাও ভেসে গেছে পানির স্রোতে। এখন থাকার মতো নিজের কোনো জায়গা নেই।

রোববার (৯ আগস্ট) সরকারপ্রধান বাঁশখালীতে আসছেন, এমন খবর পেয়ে শেষ আশাটুকু নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন তাকে এক নজর দেখতে। কিন্তু কঠোর নিরাপত্তার কারণে মূল প্রোগ্রামে তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

সারাদিনের ক্লান্তি আর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অবশেষে সমুদ্রপাড়ের একটি গাছের শেকড়ে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন এই নারী। এ সময় কথা হয় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে, তিনি জানান তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা আর সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় কীভাবে নিজের শেষ সম্বলটুকু নিঃশেষ হতে দেখেছেন।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শাহানুর আক্তার বলেন, বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে গেছে। এখন তো আমার আর কিছুই নেই। আমি সরকারের কাছে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই বা ঘর চাই।

অভিযোগ করে তিনি বলেন, আজ প্রধানমন্ত্রী এসেছেন ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে ঘরের চাবি তুলে দিতে। কিন্তু আমি ঘরের মুখ দেখিনি। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বললে তারা বলেন, আমার কেউ নাই থাকার। আমার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক নেই আজ প্রায় ১০-১৫ বছর হতে চলল। আমার খোঁজ কেউ নেয় না। বন্যায় গুটিকয়েক ত্রাণ পেলেও আশ্রয়টুকু পাইনি।

তিনি আরও বলেন, বাবার বাড়িতে থাকাকালে একটি জায়গা কিনেছিলাম। সেই জায়গা ছেলের নামে লিখে দিয়েছি। তারপর সেও আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এখন তো আমার আল্লাহ ছাড়া কেউ নাই। আমাকে একটি সুন্দর ঘর বানিয়ে দিলে আমি খুব খুশি হব। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি ঘর চাই।

রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। সাম্প্রতিক বন্যায় গৃহহারা ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত কর্মসূচিতে যোগ দিতেই ছিল তার এই সফর। দুপুর পৌনে ২টার দিকে বাহারছড়া ইউনিয়নের সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় নির্মিত হেলিপ্যাডে অবতরণের পর সমুদ্রপাড়েই আয়োজিত জনসভায় যোগ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী সেখানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে নতুন নির্মাণকৃত ঘরের চাবি তুলে দেন এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত তালিকাভুক্তদের পুনর্বাসনের জন্য আমরা সরকারের নির্দেশনায় কাজ করছি। যাদের নাম তালিকায় নেই বা যারা বাদ পড়েছেন, তারা আমাদের অফিসে এসে যোগাযোগ করলে আমরা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব। কোনো অসহায় মানুষ যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে আমরা সবসময় আন্তরিক।

প্রিয়জনদের হারিয়ে, বন্যায় সর্বস্ব খুইয়ে দেশের সরকারপ্রধানের কাছে নিজের দুর্দশার কথাটুকু পৌঁছে দেওয়ার আকুতি নিয়ে সমুদ্রের নোনা বাতাসের পাশে একাকী বসেই ছিলেন শাহানুর।

জেআই