রাজধানীর পল্লবীতে প্রকাশ্যে চা-দোকানের সামনে প্রাইভেটকারে এসে কথিত মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে গুলি করে রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল। মূলত মাদক বিক্রির ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগির দ্বন্দ্বের জেরে রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল প্রকাশ্যে গুলি করে।
ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন এবং রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল দুজনেই মাদক ব্যবসায়ী। ১৫ লাখ টাকার একটি ইয়াবার চালান বিক্রি করে আলমগীর কিন্তু সেই টাকার ভাগ রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেলকে দেয়নি। বেশ কিছুদিন ধরে তাকে এই টাকা নিয়ে ঘোরাতে থাকে। সেই ক্ষোভে গত ৭ আগস্ট বিকেলের দিকে প্রকাশ্যে ল্যাংড়া রুবেল প্রাইভেটকারে এসে আলমগীর হোসেনকে লক্ষ্য করে মাথার ডান পাশে পেটে ও পিঠে গুলি চালায়। এতে আলমগীর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে পড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনায় পথচারী জোসনা নামে এক নারীও গুলিবিদ্ধ হয়।
এই ঘটনায় পর গুলিবিদ্ধ আলমগীরের স্ত্রী রিনা আক্তার পরদিন ৮ আগস্ট পল্লবী থানায় রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল, পাপ্পু ওরফে পাপ্পা দুইজনের নামসহ অজ্ঞাত ৩ থেকে ৪ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।
ইতোমধ্যে মিরপুর ডিবি বিভাগের অভিযান পরিচালনাকালে অস্ত্র উদ্ধারের দুটি বিশেষ ভিডিও ফুটেজ ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, হাতকড়া পরা অবস্থায় অভিযুক্ত রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল ও বাপ্পা রূপনগরের বেড়িবাঁধ এলাকার একটি জায়গায় মাটির নিচে ব্যবহৃত অস্ত্র পুঁতে রেখেছিলেন। সেই অস্ত্রটি কোথায় রেখেছেন সেটিও তারা দেখিয়ে দেন। এরপর মিরপুর ডিবি পুলিশ মাটির নিচ থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ল্যাংড়া রুবেল স্বীকার করেন, প্রাইভেটকার থেকে ওই পিস্তল দিয়ে তিনি আলমগীরকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। ওই পিস্তল মাটির নিচে পুঁতে রাখতে বাপ্পাকে নির্দেশ দেন ল্যাংড়া রুবেল।
এ ঘটনায় মামলার এজাহারে গুলিবিদ্ধ আলমগীরের স্ত্রী রিনা আক্তার উল্লেখ করেন, পূর্বশত্রুতার জের ধরে একটি প্রাইভেটকারে করে রুবেল, পাপ্পুসহ কয়েকজন সেখানে আসে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুবেল পিস্তল দিয়ে আলমগীরের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করেন।
এজাহারে তিনি আরও জানান, গুলিটি আলমগীরের মাথার ডান পাশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। গুলির আঘাতে তিনি মাটিতে পড়ে গেলে, তাকে লক্ষ্য করে পেটে ও পিঠে আরও দুই রাউন্ড গুলি করা হয় বলে অভিযোগ করেন। এরপর পাপ্পুসহ অন্যরা গুলি চালাতে থাকে। এ সময় একটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পথচারী জোসনার পায়ে লাগে। তারপর হামলাকারীরা আশপাশের লোকজনকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে প্রাইভেটকারে করে ওই স্থান থেকে পালিয়ে যায়।
মিরপুর গোয়েন্দা বিভাগ থেকে জানা গেছে, ল্যাংড়া রুবেল ও আলমগীর হোসেন দুজনেই মাদক ব্যবসায়ী একসঙ্গে মাদক ব্যবসা করে। সে এবং আলমগীর মাছের ব্যবসার আড়ালে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১০ থেকে ১২ টি মামলা রয়েছে। ১৫ লাখ টাকার ইয়াবা বিক্রির টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে আলমগীরকে লক্ষ্য করে রুবেলসহ বেশ কয়েকজন প্রাইভেটকারে এসে গুলি করে। পরে আলমগীর ও এক পথচারী নারী গুলিবিদ্ধ হয়। এই ঘটনার পর থেকে মিরপুর গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত শুরু করে। গতকাল রাতে গাজীপুর থেকে ল্যাংড়া রুবেল ও তার সহযোগী বাপ্পা ওরফে পাপ্পুকে অস্ত্রগুলিসহ গ্রেপ্তার করে ডিবি মিরপুর বিভাগ। এ সময় যে প্রাইভেট কারে করে এসে গুলি করেছিল সেই প্রাইভেটকারটিও উদ্ধার করা হয়।
ডিবির একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, রূপনগর বেড়িবাঁধ এলাকায় মাটির নিচে যে পিস্তল দিয়ে গুলি করেছিল সেই পিস্তল এবং ম্যাগাজিন পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পুঁতে রাখে। পরে ল্যাংড়া রুবেল ও পাপ্পুকে গ্রেফতারের পর তাদের দেখানো জায়গা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। ল্যাংড়া রুবেল নিজেই প্রাইভেটকার থেকে গুলি ছোড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। মূলত, মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে আলমগীর কে গুলি চালায় ল্যাংড়া রুবেল।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা হাসান অভিযোগ করে বলেন, পল্লবী থানা এলাকার মিরপুর-১১, কালশী, মোড়াপাড়া ক্যাম্প ও মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ব্যবহার এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রুপ সক্রিয়। তাদের মধ্যে রুবেল ও তার সহযোগীদের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। এক বছর আগে রুবেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে শুক্রবার আলমগীরকে গুলি করতে পারতো না।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার সাব-ইন্সপেক্টর মো. সাইফূল ইসলাম বলেন, মাছ ব্যবসায়ী আলমগীরকে গুলি করার ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা করেছে। এই মামলার দুজন নামধারী আসামি ও ৩ থেকে ৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ল্যাংড়া রুবেলের বিরুদ্ধে মামলা আছে কিনা বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে। রুবেল একজন মাদক কারবারি। গুলির ঘটনায় আমাদের তদন্ত কার্যক্রম চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান চলমান আছে।
এসএএ/জেআই
