‘আদিবাসী’ হিসেবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিকার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আদিবাসী’ স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে অনেক ভূরাজনৈতিক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রাম। ভৌগোলিক, সামরিক ও সম্পদের দিক থেকে এ অঞ্চল রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশেষ মহল পরিকল্পিতভাবে এ জায়গায় ‘আদিবাসী’ শব্দটি টেনে আনার চেষ্টা করছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশান-২-এর একটি হোটেলে ‘ইন্ডিজেনাস আইডেন্টিটি ইজ ইরিলেভেন্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচটিআরএফ)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।
তাজুল ইসলাম বলেন, আদিবাসী হিসেবে যদি এই আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা আছেন তাদের যদি স্বীকৃতি দেওয়া হয় সমস্যাটা হচ্ছে যে প্রথমত তারা আদিবাসী না। কারণ এই ভূখণ্ডে বাঙালি যারা আছেন তারা এসেছেন ৪ হাজার বছর আগে আর চাকমারা যারাই বলেন, এদের আগমনের ইতিহাস ৩০০ থেকে ৪০০ বছর আগে। এখন ৪০০ বছর আগে যে এসেছে তাকে যদি আমি আদিবাসী বলি, তাহলে ৪ হাজার বছর আগে যে এসেছে তাকে আমি কী বলব? এটা মেনে নেওয়া হবে ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রাকে হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্য বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার হবে।
এটার পেছনে অনেক ভূরাজনৈতিক কারণ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী-এমপি যারা এখানে আছেন, রাজনীতিবিদ সবার এটা বোঝা দরকার। কারণ বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডের নাম হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটা ভৌগোলিক, সামরিক এবং সম্পদের দিক থেকে কতটা রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝতে হবে। একটি বিশেষ মহল পরিকল্পিতভাবে এই জায়গায় এই আদিবাসী শব্দটা টেনে আনার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়া মানে হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপরে আপনি আপনার রাষ্ট্রের অধিকার হারাবেন। কারণ আদিবাসী হিসেবে তখন জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী ভূখণ্ডের ওপরে, সম্পদের ওপরে, সামরিক বাহিনী তাদের সবকিছু নিজস্ব হবে। তার মানে বাংলাদেশের এই এক-দশমাংশ ভূখণ্ড আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে। এই বিষয়টা তো এত সিম্পল না। সুতরাং আমাদের রাজনীতিবিদদের এই বিষয়টা ভালোভাবে উপলব্ধি করা দরকার।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল, বাংলাদেশের যে ভূখণ্ডগুলো পাকিস্তান বলে স্বীকৃত ছিল সবগুলো বাংলাদেশের টেরিটরির অখণ্ড অংশ। আমাদের সংবিধানে সবচেয়ে ভালো কাজটা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব করেছিলেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যখন বলা হলো, তখন আর কেউ আর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক না। আমি বাঙালি বাংলাদেশি, মং বাংলাদেশি, চাকমা বাংলাদেশি—সুতরাং কোনো সমস্যা নেই।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত ও প্রাণহানির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তারপরেও মনে রাখতে হবে এই হিলট্র্যাক্সে ১৯৮০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মোটাদাগে ২১টি গণহত্যায় ৩৮ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার অধিকাংশ বাঙালি। আমাদের একজন বীরউত্তম আছেন শহীদ লেফটেন্যান্ট মুশফিক, অজস্র সেনা সদস্যের প্রাণ দিয়েছে এই ভূখণ্ডটিকে রক্ষা করার জন্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভূরাজনৈতিক খেলার মাঠে পরিণত করার চেষ্টা চলছে দাবি করে তাজুল ইসলাম বলেন, এইটা জিওপলিটিক্যাল একটা খেলার মাঠে পরিণত করতে চায় নানা অপশক্তি। এটা আমাদের রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান একবারের জন্যই করতে হবে। বারবার এটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা যাবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ইন্ধন আছে, আশেপাশে অঙ্গরাজ্যগুলোতে ক্যাম্প করে সেখান থেকে বাংলাদেশে ইনসার্জেন্সি করা এই যে কাজগুলো করে এতগুলো বাঙালি মেরেছে, ৩৮ হাজার বাঙালি কখনো আলোচনা করেন আপনারা, আপনারা জানেনও না।
তিনি বলেন, সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের আলোচ্য বিষয় হতে হবে। এটা বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড। এটা আমাদের ভূরাজনৈতিক কৌশলগত ভূখণ্ডের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবশ্যই আমাদের রাজনীতিবিদরা এই ব্যাপারে যথার্থ পদক্ষেপ নেবেন।
এমএসি/এমএন
