বিজ্ঞাপন

হাতি সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান বনমন্ত্রীর

হাতি সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান বনমন্ত্রীর

মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও তা কমিয়ে সহাবস্থানে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বড় শক্তি। একই সঙ্গে হাতির কারণে ফসলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি ফসলের বিমার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

বুধবার (১২ আগস্ট) আগারগাঁওয়ের বন অধিদপ্তরের হৈমন্তি মিলনায়তনে বিশ্ব হাতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘বিশ্ব জুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’।

আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, আমি মনে করি হাতি সংরক্ষণ আমাদের জন্য কর্তব্য। আমরা মানুষ এবং হাতির দ্বন্দ্বকে নিরসন তো একদম করতে পারবো না। কিন্তু এটাকে কমিয়ে এনে একটা সহাবস্থানে আনা যেতে পারে। ধরেন যার ধান খেত নষ্ট করেছে হাতি, আমরা তাকে এক হাজার টাকা দিচ্ছি। উনি যদি দেড় হাজার টাকা চায়, তাহলে তো আমি ক্ষতির কিছু দেখি না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি ফসলের ক্ষতির ক্ষেত্রে বিমার সুযোগ করা যায় কি না, সেটিও দেখতে বলেন বন অধিদপ্তরকে।

বনমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বন্য হাতির সংখ্যা ২৬৮টি, পরিযায়ী বন্য হাতি ৯৩টি এবং পোষা হাতির সংখ্যা ৯৬টি। বন উজাড়, বনের মধ্য দিয়ে রাস্তা-রেললাইন ও বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী অপরাধের কারণে হাতি নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এতে ৪০টি অগ্রাধিকার কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ-হাতি সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা-২০২১ অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং জানমালের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০১২ সাল থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আক্রমণে নিহত ৩২২ জনের পরিবার, আহত ১৬৯ জন এবং ঘরবাড়ি ও পশুর ক্ষয়ক্ষতির শিকার ৩ হাজার ২১৫টি পরিবারকে মোট ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। হাতি অধ্যুষিত এলাকায় এ পর্যন্ত ১৬০টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে কমবেশি ১০ জন সদস্য রয়েছেন। ফসলের জমি কিংবা লোকালয়ে হাতির আগমন সম্পর্কে সতর্কতা দেওয়া, হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ উপায়ে মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে এসব দল কাজ করছে।

মন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি, হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে হাতি সংরক্ষণ কখনোই সম্ভব হবে না। মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা রেঞ্জে পরীক্ষামূলকভাবে ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ২০২৫ সালে হাতি প্রকল্প নিয়েছে। প্রকল্পটির আকার আরও বাড়ানোর বিষয়টি আমি মন্ত্রণালয়ে আলোচনা করবো।

তিনি বলেন, হাতির খাদ্য ও আবাসস্থল উন্নয়নে এ পর্যন্ত হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী ৩ হাজার ২৪৮ হেক্টর বাগান তৈরি করা হয়েছে। বনায়ন কার্যক্রমে হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী বৃক্ষের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত। আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের মধ্যে বৈঠকের ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পরবর্তী দ্বিপক্ষীয় সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বন্যপ্রাণী অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করার কথা জানিয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এ বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার, পাচার ও অবৈধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। হাতি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

পোষা বা ক্যাপটিভ হাতির কল্যাণের ওপরও গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে হাতি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান প্রাণী। তাই পোষা বা ক্যাপটিভ হাতির ক্ষেত্রে তাদের কল্যাণ, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক আচরণ ও প্রয়োজনের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সবশেষে হাতি সংরক্ষণকে শুধু সরকারের দায়িত্ব না দেখে সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তবে শুধু সরকারের উদ্যোগেই যথেষ্ট নয়। হাতি সংরক্ষণ একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। বন বিভাগের মাঠকর্মী, বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক, গণমাধ্যমকর্মীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, হাতির আবাসস্থল রক্ষা মানে শুধু হাতিদের রক্ষা করা নয়। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রতিবেশ, পরিবেশ, বন, জীববৈচিত্র্য এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে সক্ষম হব।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ, শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী।

এমএইচএন/এসএএস