পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের গুম-খুনসহ বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল কোনো শিক্ষা নিয়েছে কি না এমন প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
অংশীজনদের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ উপেক্ষা করে খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ এবং খসড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার (১২ আগস্ট) এক বিবৃতিতে এমন উদ্বেগের কথা জানায় টিআইবি।
টিআইবি বলছে, অনুমোদিত দুই খসড়া আইনে বেশ কিছু ইতিবাচক বিষয় রাখা হলেও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে অংশীজনরা আপত্তি জানিয়েছিলেন, সেগুলো বহাল রাখা হয়েছে। একইভাবে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের যে খসড়াটি অনুমোদিত হয়েছে, সেখানেও অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে দায়মুক্তি সহায়ক ধারাসমূহ বহাল রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় শৃঙ্খলাবাহিনী হিসেবে সংজ্ঞায়িত বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অথচ নতুন খসড়ায় ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারা প্রায় অপরিবর্তিত রেখে এসব ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা বাহিনী প্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। ২০০৯ সালের আইনের এ দুর্বলতার কারণেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। একই কারণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘এ’ ক্যাটাগরির মর্যাদাও অর্জন করতে পারেনি।
টিআইবি অভিযোগ করে বলেছে, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখা হয়েছে। অন্য সদস্যদের মনোনয়নের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রভাব থাকার সুযোগ থাকায় কমিশনের ওপর সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কমিশনে নারী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা না থাকায়ও উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি।
এ ছাড়া কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বলা হলেও এটি সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতামুক্ত থাকবে এ বিষয়টি খসড়ায় স্পষ্ট করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপন, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে সরকারের পূর্বানুমোদন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ কমিশনকে কার্যত সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে টিআইবি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের সময় প্রণীত মানবাধিকার কমিশন আইনের প্রথম খসড়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ‘কেবল সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশ’কে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ না করার বিধান ছিল। কিন্তু মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় ওই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ বা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এমন স্থান পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ‘সামরিক আটক কেন্দ্র’কে কমিশনের এখতিয়ার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ কী? তাহলে কি আয়নাঘর বহাল রাখার ক্ষেত্রে সরকারের সমর্থন রয়েছে?
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, গুমের মতো স্পর্শকাতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকার কমিশনের বাইরে রেখে পুলিশের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। গুমের অধিকাংশ ঘটনায় যাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তারা শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য। ফলে তাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্ত পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তিনি আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমে জড়িত থাকার অভিযোগের ক্ষেত্রে অধস্তন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন’ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সন্তোষজনক সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়া গেলে ম্যাজিস্ট্রেট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন। বাস্তবে এ ধরনের বিধান গুমের অপরাধের বিচারহীনতা নিশ্চিত করবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে।
টিআইবি বলছে, অনুমোদিত খসড়ায় গুমের সংজ্ঞায় জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পাশাপাশি ২০২৫ সালের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে যে ধরনের আটককেন্দ্র, কারাগার, হাজতখানা ও গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, অনুমোদিত খসড়ায় তার অনেকটাই রাখা হয়নি।
জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় মানবাধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংসদে উত্থাপনের আগে দুই খসড়া আইনই ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করারও দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
আরএম/আরএফ
