প্রস্তাবিত অভিন্ন পারিবারিক আইনই নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের চিন্তার বিনির্মাণ জরুরি। এ জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আলোচনা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদের উদ্যোগে রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রস্তাবিত অভিন্ন পারিবারিক আইন নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। মুখ্য আলোচক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ, আইনবিদ ও গবেষক ফউজুল আজিম।
সভায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেহানা মাসুদা বেগম, লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সিউতি সবুরসহ সংগঠনের নেত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষার্থীসহ সভায় মোট ৫০ জন অংশ নেন।
লিগ্যাল এইড অফিসার সিননোমে মারমার সঞ্চালনার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের নারীর বঞ্চনার শেকড় তাদের সম্পত্তি ও প্রজনন ক্ষমতার অধিকারহীনতার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। অসমতা তৈরির এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে চিন্তা করা এবং মানসিক প্রস্তুতি তৈরির জন্য নিজেদের চিন্তার বিনির্মাণ জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জন্মলগ্ন থেকেই এ বিষয় নিয়ে কাজ করছে। পারিবারিক আইনের সুযোগ হিসেবে নারীকে গৃহবন্দি করার মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতার পথ সুগম হয়েছে- এ বিষয়টি সংগঠনটি অনুধাবন করেছে। সেখান থেকেই নারীর প্রতি সংঘটিত সব ধরনের সহিংসতার অবসানে সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে।
মালেকা বানু তরুণদের উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের এসব বিষয় জানতে, বুঝতে ও অনুধাবন করতে হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সিউতি সবুর বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিদিনের যাপিত জীবনের সব ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগিতা তৈরি করে না। বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্ম এবং সেই অনুযায়ী প্রবর্তিত আইনের প্রয়োগ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ও নারীদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে।
তিনি বলেন, এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অংশ হিসেবে উঠে আসে। সেগুলোই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার জন্য এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে।
মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা বলেন, আশির দশক থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার তিনটি ধাপে কাজ করে যাচ্ছে। সহিংসতা বন্ধে শেকড় থেকে পরিবর্তন আনতে হলে মানুষকে ভাবতে শিখতে হবে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের চিন্তার বিনির্মাণের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, অভিন্ন পারিবারিক আইনই প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে সহিংসতার মাত্রা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে।
মুখ্য আলোচক ফউজুল আজিম অভিন্ন পারিবারিক আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি রোমান আইন, ক্যানন আইন ও ব্রিটিশ ভারতের আইনি ইতিহাসের সঙ্গে অভিন্ন পারিবারিক আইনের তুলনামূলক আলোচনা করেন।
এ ছাড়া অভিন্ন পারিবারিক আইনের যৌক্তিকতা, তাত্ত্বিক ভিত্তি, সম্ভাব্য সুফল, সমালোচনা, বৈশ্বিক চিত্র, সিডও সনদের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। পাশাপাশি আইনটির বিপক্ষের যুক্তি, আইন বাস্তবায়নে মহিলা পরিষদের ভূমিকা, অভিন্ন পারিবারিক আইনের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা এবং আইনটি প্রবর্তনের বিভিন্ন কৌশল নিয়েও মত দেন।
ফউজুল আজিম বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে একই সঙ্গে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার কার্যকর রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধর্মীয় আইন ও অভিন্ন পারিবারিক আইন ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকা জরুরি। অন্য সব ধর্ম, গোত্র ও সম্প্রদায়ের মানুষের মতো ব্রাহ্ম সমাজের বিষয়টিও আইনে থাকা দরকার।
মতবিনিময় সভায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিন্ন পারিবারিক আইন বিষয়ে দলগত তিনটি উপস্থাপনা করেন। এতে মুসলিম পারিবারিক আইন, হিন্দু ও বৌদ্ধ পারিবারিক আইন এবং খ্রিষ্টান পারিবারিক আইনের বাংলাদেশে প্রচলিত আইন ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োগহীনতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা উপস্থাপন করেন।
সিননোমে মারমা বলেন, বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীর কেউ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, আবার কেউ নিজ নিজ গোত্রের প্রথা অনুসরণ করেন। কিন্তু পারিবারিক ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কেউ হিন্দু আইন, কেউ খ্রিষ্টান আইন অনুসরণ করেন। এ কারণে বৌদ্ধ পারিবারিক আইন থাকা খুব জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, শিক্ষার্থীরা অভিন্ন পারিবারিক আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী- এটি আনন্দের বিষয়।
তিনি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে সংগঠনকে অবহিত করার আহ্বান জানান।
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আজ থেকে আমরা একা নই, একঝাঁক তরুণ-তরুণী আমাদের আন্দোলনের সারথি।’ তাদের অভিজ্ঞতা ও চাহিদা সমবেত আন্দোলনকে আরও বেগবান ও দীর্ঘস্থায়ী করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি বলেন, তরুণদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
জেইউ/আরএফ
