প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবসহ অন্য কর্মকর্তাদের নাম, পদবি ব্যবহার করে ভুয়া ভিজিটিং কার্ড তৈরি এবং তাদের মোবাইল নম্বর ক্লোন বা স্পুফিং করে প্রতারণার অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি অসাধু চক্র। সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে অর্থ বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার এসব চেষ্টার প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
একই সঙ্গে কোনো ফোনকল, বার্তা বা ভিজিটিং কার্ড পেয়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচয় ও তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সব সিনিয়র সচিব ও সচিব, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, এসএসএফের মহাপরিচালক, ডিজিএফআইর মহাপরিচালক, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, ‘সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, অসাধু একটি চক্র প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তাদের নাম, পদবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া (ফেইক) ভিজিটিং কার্ড তৈরি, মোবাইল নম্বর ক্লোন/স্পুফিং করে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’

এতে বলা হয়, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের নিকট থেকে অর্থ সুবিধা বা অন্যান্য অনৈতিক সুবিধা প্রাপ্তির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে।’
এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, ‘এ ধরনের ফোনকল, বার্তা, ভিজিটিং কার্ড বা অন্য কোনো পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে কোনো প্রকার আর্থিক বা প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণ না করার জন্য এবং প্রয়োজনবোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচয় ও তথ্য যাচাই করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
একই সঙ্গে বিষয়টি অধীনস্থ দপ্তর বা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠিতে অনুরোধ করা হয়।
এ বিষয়ে সচিবালয়ে অবস্থিত একটি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি পাওয়ার পর তারা তাদের অধীনস্থ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দপ্তর-সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেছেন।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নাম ও খাম ব্যবহার করে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি খামে সাত পাতার ডকুমেন্ট পাঠানো হয়। সেই খামে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, মুখ্য সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরসংবলিত ডকুমেন্টস ছিল।
নথিগুলোর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলে বিষয়টি তদন্তের জন্য ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে পাঠানো হয়। সেই চিঠির সূত্র ধরে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম, পরিচয় ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ভুয়া নথি তৈরির বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে।
তদন্তে নেমে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ জানতে পারে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সিল, স্বাক্ষর ও অফিসিয়াল লেটারহেড জাল করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। এরপর মাদারীপুরের কালকিনি থানা এলাকা ও কুষ্টিয়া থেকে আসামি ফারুক হোসেন, সাকিব খান, মাসুম মুনসী, মীর তৌহিদুল ইসলাম ও বকুল মন্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় গত ৫ আগস্ট ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রায়হানুর রহমান বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা করেন। ওইদিন আসামিদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে পুলিশ। পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার আসামিদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রী এমপিদের সিল ও স্বাক্ষর সম্বলিত লেটারহেড প্যাড জব্দ করা হয়।
জাল নথি তৈরি এবং প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার ছয় আসামির সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ঢাকার একটি আদালত। গত বুধবার (১২ আগস্ট) পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন।
এসএইচআর/বিআরইউ
