দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা পাওয়ার ঘটনা এবং নতুন করে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ বাহিনী। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে পুলিশের সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট ডিএমপির সদস্যদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির সদস্যদের এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজারবাগস্থ বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে জুলাই-২০২৬ মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ডিএমপির সদস্যদের উগ্রবাদ নিয়ে সতর্কতা দেওয়া হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির ও ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঢাকার সাভারে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্যরা বোমা তৈরির শক্তিশালী ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনার তথ্য উঠে আসার পর এ বিষয়ে সতর্কতা দেওয়া হয়। নব্য জেএমবির সদস্যরা বোমা তৈরির শক্তিশালী ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল বলে জানায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।
এ ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার প্রস্তুতি, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ ও সংগঠনটির আদর্শ-সত্তাকে সমর্থনের অভিযোগে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ছয় থেকে সাতজনকে আসামি করা হয়।
সিটিটিসি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদে সাভারে বোমা তৈরির ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া যায়। নব্য জেএমবির সদস্য নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’ বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া যায়। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কেরানীগঞ্জে একটি আস্তানা গড়ে তোলার পর সাভারে বোমা তৈরির জন্য শক্তিশালী ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি ভাড়া বাসা থেকে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও বোমা তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম উদ্ধারের কথাও জানায় সিটিটিসি। উদ্ধার করা আলামতের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, ডেটোনেটর, রিমোট ও কন্ট্রোলার, বৈদ্যুতিক তার, ভোল্টমিটার, স্প্রিং, জিআই তার, বিয়ারিং বল, গ্যাস ক্যান, গ্যাস টর্চ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি নিষ্ক্রিয়কৃত পাইপ বোমার ধ্বংসাবশেষ (আইইডি) উদ্ধার করা হয়।
সিটিটিসির এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সাভার থেকে গ্রেপ্তার আরিফের জিজ্ঞাসাবাদে বোমা তৈরির ল্যাব স্থাপন এবং সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে নব্য জেএমবির সংশ্লিষ্টতা, সম্ভাব্য আস্তানা ও হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
সভা সূত্রে জানা যায়, জেএমবির সদস্যদের বোমা তৈরির শক্তিশালী ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে নব্য জেএমবির সদস্যরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। উগ্রবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ঢাকা ও এর আশপাশে অবস্থান নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে ডিএমপির আওতাধীন এলাকার বাসাবাড়ি ও মেসে তারা অবস্থান নিতে পারে।
এক্ষেত্রে বাসা কিংবা মেসে নজরদারি বৃদ্ধি করার জন্য সভায় পুলিশ সদস্যদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। উগ্রবাদের বিষয়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি রাজধানীতে টহল বৃদ্ধি করার জন্য ডিএমপির সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সভায় উপস্থিত থাকা ডিএমপির এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, সভায় আইনশৃঙ্খলাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ডিএমপির সদস্যদের উগ্রবাদ নিয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। এমনকি উগ্রবাদের বিষয়ে আইনি কার্যক্রম পরিচালনা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে থানার ওসিদেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সভায় ঢাকার থানা এলাকার হোটেল ও স্পা সেন্টারে কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড যাতে পরিচালিত না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি চলমান রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মাদক সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, মাদক কারবারি ও এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে।
ছিনতাই প্রতিরোধে ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সিটিটিসি ও ডিবিকে ২৪ ঘণ্টা মাঠে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার। ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অভিযান জোরদারের পাশাপাশি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি।
এ ছাড়া প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এবং ক্রাইম বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার। মামলার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও তদন্ত কার্যক্রম আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যথাযথভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেন তিনি।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার।
অন্যদিকে সভায় চুরি, ছিনতাই, নাইট ক্লাব ও স্পা সেন্টারের বিষয়ে আলোচনা হয়। সভা সূত্রে জানা যায়, ডিএমপির সদস্যদের আভিযানিক কার্যক্রম ছাড়া কোনো নাইট ক্লাব কিংবা স্পা সেন্টারে যেতে নিষেধ করা হয়। কারণ ডিএমপি সদরদপ্তরে এ বিষয়ে অনেক অভিযোগ এসেছে যে, পুলিশ সদস্যরা নাইট ক্লাব কিংবা স্পা সেন্টারে গিয়ে চাঁদা নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মাসোহারা পর্যায়ে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তাই সভায় ডিএমপির সদস্যদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়, আভিযানিক কার্যক্রম ছাড়া ডিএমপির কোনো সদস্য যেন স্পা সেন্টার কিংবা নাইট ক্লাবে না যান। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় সভায়।
এদিকে সভায় রাজধানীতে চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধে থানা পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কঠোরভাবে বলেন, কোনো থানা এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে এবং তা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট থানা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে ওই থানার কাছে জবাবদিহি চাওয়া হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে পুলিশের টহল জোরদার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, মাসিক অপরাধ সভায় চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে টহল বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি কোনো এলাকায় ধারাবাহিকভাবে চুরি-ছিনতাই হলে কেন তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলা হয়।
এমএসি/আরএফ
