বিজ্ঞাপন

সরকারি গাড়িতে প্রতিমন্ত্রীদের ‘না’, সাশ্রয় হবে ১৪ কোটি টাকা

সরকারি গাড়িতে প্রতিমন্ত্রীদের ‘না’, সাশ্রয় হবে ১৪ কোটি টাকা

জ্বালানি সাশ্রয়, সরকারি ব্যয় কমানো ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারের অংশ হিসেবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন না সরকারের অন্তত ১৫ জন প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী পদমর্যাদার কর্তারা। তাদের এ সিদ্ধান্তের ফলে পাঁচ বছরে সরকারের সম্ভাব্য সাশ্রয় হতে পারে প্রায় ১৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। 

এই তালিকায় রয়েছেন– স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত-এর মতো প্রতিমন্ত্রীরাও।

ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকেও সরকারি গাড়ির সুবিধা না নেওয়ার এ সিদ্ধান্তকে সরকারি ব্যয় কমানো এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রতিমন্ত্রীর সরকারি গাড়িতে দৈনিক প্রায় ১৮ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ রয়েছে। প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ১৪৫ টাকা হিসাবে প্রতিদিন জ্বালানি বাবদ খরচ হয় প্রায় ২ হাজার ৬১০ টাকা। মাসে এ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজার ৩০০ টাকা। বছরে জ্বালানি বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ৯ লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ টাকা। পাঁচ বছরে শুধু জ্বালানি বাবদ সরকারের ব্যয় হতে পারে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা।

এর সঙ্গে গাড়ির ইঞ্জিন অয়েল বা মবিল, চালকের বেতন এবং গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত ব্যয়ও যুক্ত হয়। হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরে মবিল ও ইঞ্জিন অয়েল বাবদ আনুমানিক ৮ লাখ টাকা, চালকের বেতন বাবদ প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বাবদ আরও প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে একজন প্রতিমন্ত্রী বা সমপর্যায়ের ব্যক্তির সরকারি গাড়ির পেছনে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯৫ লাখ টাকা।

সে হিসাবে ১৫ জন প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী পাঁচ বছর সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করলে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি গাড়ি ব্যবহার থেকে বিরত রয়েছেন এমন প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়দ ইসলাম, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর (সুমন), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। শুধু প্রতিমন্ত্রীরাই নন, সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টাও পরিবহন পুল থেকে কোনো সরকারি গাড়ি নেননি। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন।

তাদের মধ্যে রয়েছেন– প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও মো. রুহুল কবির রিজভী, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, ডাক ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি সরকারি গাড়ির পরিবর্তে নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করছেন।

এদিকে সরকারি ব্যয় কমানো ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারের অংশ হিসেবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন না খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি, চালক এবং নিজ খরচে কেনা জ্বালানি ব্যবহার করে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কর্মদিবস থেকেই নিজের গাড়িতে সচিবালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। তার এ সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে সরকারি গাড়ি ব্যবহার থেকে বিরত রয়েছেন এসব প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরাও।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বহরও ছোট করা হয়েছে। আগে তার নিরাপত্তা বহরে ১৩ থেকে ১৪টি গাড়ি থাকলেও বর্তমানে তা কমিয়ে চারটিতে আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে পুলিশের দীর্ঘ সারিবদ্ধ অবস্থানও বাতিল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সমসাময়িক ঘটনার বিশ্লেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. মো. সহিদুজ্জামান সবুজ বলেন, সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার এই সিদ্ধান্তকে শুধু অর্থ সাশ্রয়ের হিসাব দিয়ে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের বিষয়টিও জড়িত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যদি নিজেদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে উদাহরণ তৈরি করেন, তাহলে তা প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, একটি গাড়ির পেছনে শুধু জ্বালানি নয়, চালকের বেতন, মবিল, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতসহ দীর্ঘমেয়াদি নানা ব্যয় থাকে। ফলে একাধিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধি সরকারি গাড়ির সুবিধা না নিলে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর এর দৃশ্যমান প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদের অপচয় রোধে এটি একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

ড. সহিদুজ্জামান আরও বলেন, বর্তমান সময়ে সরকারের ব্যয় সংকোচন এবং জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে এ ধরনের উদ্যোগ যেন শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, সরকারি গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা যদি প্রয়োজনের বাইরে সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ না করেন, তাহলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের ব্যয় কমবে, অন্যদিকে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে দায়িত্বশীলতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।

তিনি বলেন, সরকারি গাড়ির ব্যয় শুধু জ্বালানি বা গাড়ির মূল খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে চালকের বেতন, মবিল, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতসহ নানা ধরনের নিয়মিত ব্যয় যুক্ত থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এসব ব্যয় সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে যারা সরকারি গাড়ির সুবিধা নিচ্ছেন না, তাদের সিদ্ধান্তকে তাই রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগকে ব্যক্তি পর্যায়ের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারি সম্পদ ব্যবহারে একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিতে পরিণত করা প্রয়োজন। এতে সরকারের ব্যয় কমার পাশাপাশি জনগণের অর্থের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতিও আরও শক্তিশালী হবে।

এমএম/বিআরইউ