বিজ্ঞাপন

নির্ধারিত সময়ের পরও খোলা দোকানপাট ও শপিং মল

নির্ধারিত সময়ের পরও খোলা দোকানপাট ও শপিং মল

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার মধ্যে দেশের সব দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকরের প্রথম দিনেই রাজধানীতে দেখা গেছে ঢিলেঢালা চিত্র। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট খোলা ছিল এবং কোথাও কোথাও সাইনবোর্ড ও বিজ্ঞাপনের বাতিও জ্বলতে দেখা গেছে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টার পর রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও বাণিজ্যিক এলাকা সরেজমিনে ঘুরে নিয়ম অমান্যের এই দৃশ্য চোখে পড়ে।

সরকারের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সব মার্কেট, বিপণিবিতান ও দোকানপাট খোলা রাখা যাবে। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ রাখতে হবে এবং যেকোনো ধরনের সৌন্দর্যবর্ধক আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।

এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের প্রথম দিনে রাজধানীর বাড্ডা, শাহজাদপুর ও মেরুল বাড্ডা এলাকার বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময় মেনে রাত ৮টার মধ্যেই আলো নিভিয়ে দোকান বন্ধ করে দেয়। তবে অন্য অনেক স্থানেই ছিল উল্টো চিত্র।

প্রগতি সরণি এলাকায় বাটা, এপেক্স ও ওরিয়নের মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে রাত সাড়ে ৮টার পরও কেনাবেচা চলতে দেখা যায়। শুধু দোকান খোলা রাখাই নয়, ক্রেতা আকৃষ্ট করতে তাদের শোরুমে পর্যাপ্ত আলো জ্বলছিল। এমনকি এলাকার বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামফলক ও সাইনবোর্ডেও রাত ৮টার পর আলোকসজ্জা দেখা গেছে।

রাজধানীর বাড্ডার সুবাস্তু নজর ভ্যালি শপিং মলে গিয়ে দেখা যায় মলটির প্রধান সড়কের ধারের মূল ফটক বন্ধ রাখা হলেও ক্রেতাদের যাতায়াতের জন্য পার্কিংয়ের দিকের গেটটি খোলা রাখা হয়। পার্কিংয়ের ওই প্রবেশপথ দিয়ে অনায়াসেই ক্রেতারা ভেতরের পাঁচতলা ভবনটির বিভিন্ন তলায় কেনাকাটার জন্য যান। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মলের প্রতিটি ফ্লোরের দোকানপাট খোলা রেখে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাভাবিক বেচাকেনা চালাতে দেখা গেছে।

বিক্রেতারা জানান, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সপ্তাহের অন্য যেকোনো দিনের তুলনায় আজ কেনাবেচার হার অনেক বেশি থাকে। তাই মার্কেটে ক্রেতাদের ভিড় থাকায় সরকারি নির্দেশ মেনে রাত ৮টার মধ্যে দোকান গুটিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে সরকারের সময়সীমা নির্ধারণের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, রাজধানী ঢাকায় সাধারণত বিকেল ৫টার পর মানুষ শপিংয়ে বের হতে শুরু করেন এবং সাড় সাড়ে ৫টা থেকে রাত পর্যন্ত বেচাকেনার আসল ‘পিক টাইম’ চলে। দিনের বাকিটা সময় ক্রেতাদের দেখা মেলে না বললেই চলে। 

সুবাস্তু নজর ভ্যালি শপিং মলের এক পোশাক বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘শুক্রবার আমাদের মার্কেটে সাধারণত অন্য দিনের তুলনায় ক্রেতা বেশি থাকে। বিশেষ করে বিকেল সাড়ে ৫টার পর থেকেই কেনাবেচা জমে ওঠে। দিনের বাকি সময়ে অনেকেই অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এত তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে দিলে আমাদের ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়। আমরা চাই, অন্তত শুক্রবারের মতো ব্যস্ত দিনে দোকান খোলা রাখার সময় কিছুটা বাড়ানো হোক।’

ঘড়ি ও চশমার দোকানের আরেক বিক্রেতা মো. আতিক বলেন, ‘সন্ধ্যার পরই মূলত আমাদের ক্রেতা বাড়ে। বিকেল ৫টার আগে তেমন বিক্রি হয় না। এরপর সাড়ে ৫টা থেকে রাত পর্যন্তই পিক টাইম। অথচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হলে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকুই আমরা পাই না। আজও ক্রেতা ছিল, তাই দোকান বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত মানতেই হবে। সময়টা আরেকটু বেশি হলে ভালো হতো।’

শপিংমলে কেনাকাটা করতে আসা তানজিলা আক্তার নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘সারা সপ্তাহে কাজের ব্যস্ততার কারণে শপিং করার সময় পাই না। শুক্রবারই সাধারণত কেনাকাটা করতে বের হই। বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে মার্কেটে আসা আমাদের জন্য সুবিধাজনক। যদি সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে চাকরিজীবীসহ অনেক মানুষই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে পারবেন না। তাই বিশেষ করে ছুটির দিনে মার্কেট বন্ধের সময় কিছুটা বাড়ানো হলে ক্রেতাদের জন্য সুবিধা হবে।’

কয়েক দফায় বদলেছে দোকান বন্ধের সময়সূচি

বিশ্ব ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দেশে দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধের সময়সূচি এর আগেও বেশ কয়েকবার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পরে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির সেই প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপরও। 

এই পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী নীতি হিসেবে গত ২ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচি এক ঘণ্টা কমানোর পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টায় সব শপিং মল ও দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে এই সময়সীমা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা করা হয়। ঈদুল আজহার আগে ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটার সুবিধার্থে সময়সূচি কিছুদিনের জন্য শিথিল করা হলেও ঈদের ছুটি শেষে আবার সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শুরু হয়।

পরে ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে দুপুর ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হলে, গত ১১ জুন সরকার সময় সামান্য বাড়িয়ে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বেচাকেনার অনুমতি দেয়।

সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সেই সময়সীমা থেকে ফের এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশের মাধ্যমে এই নতুন সময়সূচির কথা জানানো হয়।

এমএসি/এমএন/এমএসএ