বিজ্ঞাপন

মামলা নেই ময়নাতদন্ত নেই, ৯ শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে কী ঘটছে?

মামলা নেই ময়নাতদন্ত নেই, ৯ শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে কী ঘটছে?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পাশাপাশি নিহত ৯ জনের মধ্যে ৮ জনের মরদেহেরই ময়নাতদন্ত করা হয়নি। এ দুটি ঘটনার মধ্যে ‘বিশেষ সংশ্লেষ’ দেখছেন অনেকে। তারা বলছেন, মামলা না হওয়া এবং ময়নাতদন্তও না হওয়া সন্দেহজনক।

অভিযোগ উঠেছে, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের আইনজীবী ও শ্রমিকনেতারা বলছেন, ময়নাতদন্ত না হওয়ার কারণে মৃত্যু ও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হবে। তবে পুলিশের দাবি, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, এ ঘটনার একদিন পেরিয়ে গেলেও মামলা না হওয়ার বিষয়ে পুলিশ বলছে, নিহতদের পরিবারের কেউ অভিযোগ জমা দেননি। পুলিশের পক্ষ থেকে তারপরও একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্বাভাবিক বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আটটি মরদেহের ময়নাতদন্ত না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মৃত্যু ও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে / ফাইল ছবি

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান খান বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় অস্বাভাবিক ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশকে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করতে হয়। এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের জন্য ময়নাতদন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা হলে মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ময়নাতদন্ত না থাকলে মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই এখানে প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। বারবার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও ইয়ার্ডগুলোতে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। আট শ্রমিকের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি বেশ সন্দেহজনক। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং দুর্ঘটনার জন্য কারা দায়ী, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মালিকপক্ষের কারণে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনার আগে জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, কাজ শুরুর আগে গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না– এসব বিষয় তদন্ত করা দরকার।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, চমেক হাসপাতালে ৮ জনের মরদেহ আনা হয়েছিল। বাকি একজনের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়নি। তাদের মধ্যে একজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। বাকিদের মরদেহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন সাপেক্ষে মরদেহ হস্তান্তর করেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঘটনাস্থল ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদকে একাধিকবার ফোন দেওয়ার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী মরদেহগুলো আমরা ময়নাতদন্ত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভুক্তভোগীদের পরিবার রাজি হয়নি। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতেই ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমাদের তদন্ত কার্যক্রম আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। আপাতত থানায় জিডি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের কেউ অভিযোগ জমা দেয়নি, তাই মামলা হয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মৃত্যুর কারণ মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড

গতকাল শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে গ্যাস দুর্ঘটনায় ৯ শ্রমিক নিহত হন। তারা হলেন সানি দাস, পলাশ দাস, মনসুর আহমেদ, নাসের উদ্দিন, রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, খোকন মিয়া, আব্দুল আলিম সুজন ও মতিউর রহমান সাজ্জাদ। 
দুর্ঘটনায় আরও কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। তাদের মধ্যে চারজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন। 

ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, ঘটনার দিন সকালে পুরোনো একটি জাহাজের বদ্ধ চেম্বারে কাটার কাজ করার সময় বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হন। পরে দুর্ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো।

আজ শনিবার (১৫ আগস্ট) ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষক্রিয়া। আমাদের সমন্বিত কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, জাহাজ থেকে প্রথমে হাইড্রোজেন সালফাইড অপসারণ করা হবে।

বিষাক্ত গ্যাস অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, হাইড্রোজেন সালফাইড সাধারণত পানিতে দ্রবীভূত হয়। এ কারণে সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পানি দিয়ে জাহাজের ভেতরের অংশ ধুয়ে গ্যাস অপসারণ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো বদ্ধ ও গভীর স্থানে শ্রমিকদের পাঠানোর আগে সেখানে বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জামও ব্যবহার করতে হয়। দুর্ঘটনার সময় এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তে উঠে আসবে।

শ্রমিকরা ইয়ার্ডে কাজ করার সময় হঠাৎ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন / ফাইল ছবি

এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ), শিল্প মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি দুর্ঘটনার কারণ, ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবে।

আহত শ্রমিকদের দেখতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেন। তদন্তে কারও গাফিলতি বা প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল

ফেরদৌস স্টিল এ বছরের এপ্রিলে ইন্ডিয়ান রেজিস্টার অব শিপিং এবং ক্লাসএনকে থেকে কমপ্লায়েন্স সনদ পেয়েছে। অথচ এর মধ্যেই পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি সংস্থার নোটিশ পেয়েছে তারা। মামলাও হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে এর আগেও নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। ৪ মে পুনরায় পরিদর্শনের পর আগের নির্দেশনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি না পাওয়ায় তাগিদ দেওয়া হয়। এরপর ৮ জুন দেওয়া হয় চূড়ান্ত নোটিশ। এত কিছুর পরও নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।

বিচারে আস্থা নেই, কারও জবাবদিহিতা নেই

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত মরদেহ কাটাছেঁড়া বা ময়নাতদন্ত করতে চান না। দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যেসব মামলা হয়, সেসব মামলারও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিচারও দৃশ্যমান নয়। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা যদি দেখেন, মামলা করে বা আদালতে ছুটাছুটি করেও বিচার পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে কেন তারা আদালতে যাবেন? রাষ্ট্রের উচিত, এসব অপরাধের ঘটনায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব ঢাকা পোস্টকে বলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের আগে বিচার চাইতে হবে। তারা যদি বিচার না চান, তাহলে আইনের শাসন ও আইন প্রয়োগ থাকল কোথায়? অতীতেও দেখা গেছে, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা এসব বিচারপ্রক্রিয়া থেকে সরে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, শুক্রবারের ঘটনায় আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, মামলা করবে রাষ্ট্র বা ক্ষতিগ্রস্তরা। সেখানে মরদেহের ময়নাতদন্ত করার কথা থাকলেও আদালতে আবেদন করা হচ্ছে ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য। এসব ঘটনায় সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর–যেমন পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর– যথাযথ তদারকি নেই। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কোনো কর্তৃপক্ষেরই জবাবদিহিতা নেই এবং এর ফলে কোনো দুর্ঘটনারই  যথাযথ বিচার হচ্ছে না।

এমআর/বিআরইউ