বিজ্ঞাপন

জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা

জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা

বিশ্বের জাহাজভাঙা শিল্পে বাংলাদেশের বড় অংশীদারত্ব থাকলেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নে ধীরগতি এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সর্বশেষ গত ১৪ আগস্ট ভাটিয়ারীর একটি শিপইয়ার্ডে পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু সেই উদ্বেগ আরও গভীর করেছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এর বার্ষিক সক্ষমতা ২ মিলিয়ন গ্রস টন (জিটি)-এর নিচে নেমে যেতে পারে।

সর্বশেষ এই দুর্ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, গ্যাসমুক্তকরণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টি।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি ছিল একটি পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ভেতরের গ্যাস সম্পূর্ণ অপসারণ করে নিরাপদ বা ‘গ্যাস-ফ্রি’ করা জরুরি। গ্যাসমুক্ত না করে কাটিংয়ের কাজ শুরু করলে বদ্ধ স্থানে বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের অভিযোগ, জাহাজটি এলএনজি বহন করলেও কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়নি। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রটোকল নিশ্চিত না করেই শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানো হয়। এমনকি জাহাজ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কারণে স্থানীয় জেলেদেরও সেখানে যেতে অনীহা ছিল বলে জানান তারা।

শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, সরকারি ছুটির দিনেও তাদের কাজে পাঠানো হয়েছিল। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ কাটার কাজ করানোর কারণেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, কোনো ইয়ার্ড ‘গ্রিন’ বা আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেট পেলেই সেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। নিয়মিত নজরদারি ও নিরাপত্তা বিধির বাস্তব প্রয়োগ জরুরি।

সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ‘এমটি রাসি’ জাহাজের তলায় থাকা একটি ট্যাংকের চারপাশ কাটার কাজ প্রায় শেষ হয়। প্রায় ১০ মিনিট পর ট্যাংকটি পুরোপুরি খোলার জন্য শ্রমিকরা সেখানে গেলে প্রথমে দুজন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুজন শ্রমিক ওই গ্যাসে আক্রান্ত হন। পরে কাটিং ফোরম্যান তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তিনিও অচেতন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি দেখতে মাস্ক পরে সেখানে যাওয়া একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাও কিছুক্ষণ পর জ্ঞান হারান।

প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে একের পর এক শ্রমিক ওই জায়গায় ঢুকছিলেন। কিন্তু ভেতরে যে বিপজ্জনক গ্যাস ছিল, তা তারা বুঝতে পারেননি। ফলে উদ্ধার করতে যাওয়া শ্রমিকরাও গ্যাসের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

এদিকে গ্রিন ইয়ার্ডগুলোতে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো পদ্ধতির তুলনায় গ্রিন ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটছে। তবে এ অংশে ‘৮৪টি দুর্ঘটনা’ সম্পর্কিত মূল গবেষণার সুনির্দিষ্ট তথ্য বা বাক্যটি একবার যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, জাহাজভাঙা শিল্পে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১০ জন গুরুতর এবং ১৫ জন মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন।

বিলসের সেন্টার কো-অর্ডিনেটর ও জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নানা দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ২৩৯ জন। ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১৩ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন নিহত হন। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন আরও তিনজন এবং আহত হয়েছেন ৫৪ জন।

১৪ আগস্টের দুর্ঘটনাটি এই শিল্পে নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, দুর্ঘটনার পর তদন্ত করে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ইয়ার্ডগুলোতে নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, গ্যাস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কর্মী, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে এমডিপিআই প্রকাশিত একটি গবেষণার অংশে সীতাকুণ্ডের ২১০ শ্রমিকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ৭৫ শতাংশ শ্রমিক আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং ৭০ শতাংশ নিয়মিত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ব্যবহার করেন।

তবে একই গবেষণার আরেকটি জরিপে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে মাত্র ৪২ শতাংশ শ্রমিক নিয়মিত পিপিই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। ৬৮ শতাংশ শ্রমিক বলেছেন, তারা আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ পাননি। এছাড়া ৬৫ শতাংশ শ্রমিক ধুলা, ধোঁয়া ও বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে থাকার কথা জানিয়েছেন।
গবেষণাপত্রের বিভিন্ন অংশে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে ভিন্ন জরিপের ফলাফল থাকায় এসব তথ্য পৃথক জরিপের ফল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে উভয় ফলাফলই শিল্পটির শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনে।

শিপইয়ার্ড শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হলেও কোনো ইয়ার্ডই শতভাগ নিরাপদ এমন নিশ্চয়তা নেই। শ্রমিকদের নিরাপত্তায় মালিক ও কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একসঙ্গে ৯ শ্রমিকের প্রাণহানি অত্যন্ত গুরুতর ও নজিরবিহীন ঘটনা। নিয়মিত তদারকি, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। হংকং কনভেনশনের নিয়ম মেনে জাহাজভাঙা শিল্পের গতি নয়, শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু কাগজে-কলমে নীতিমালা বা সার্টিফিকেশন যথেষ্ট নয়। ইয়ার্ডে নিরাপত্তা বিধি বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত ঢাকা পোস্টকে বলেন, শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

ইয়ার্ড সূত্র মতে, জাহাজভাঙা শিল্পের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট-সীতাকুণ্ড উপকূল। জোয়ার-ভাটার সুবিধা, বিস্তৃত আন্তঃজোয়ার অঞ্চল এবং তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চল জাহাজভাঙা শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম উপকূলে ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে এ শিল্পের বিস্তার রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫০টি সক্রিয় ইয়ার্ড রয়েছে।

ওই গবেষণায় বলা হয়েছে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ, ৫০০-এর বেশি অংশীজনের সাক্ষাৎকার এবং ২০৫০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এআরআইএমএ-ভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, হংকং কনভেনশন (এইচকেসি) বাস্তবায়ন, সবুজ প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা সক্ষমতা বছরে প্রায় ৫ মিলিয়ন গ্রস টন (জিটি) পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ব্যর্থ হলে এ সক্ষমতা ২ মিলিয়ন জিটির নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, ১৯৬৫ সালে গ্রিক জাহাজ ‘এমডি আলপাইন’ চট্টগ্রাম উপকূলে ভাঙার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সূচনা হয়। পরে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানি জাহাজ ‘আল আব্বাস’ ভাঙার মাধ্যমে এ শিল্প আরও বিস্তৃত হয়। ধীরে ধীরে চট্টগ্রামের উপকূলের ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠে বিশাল শিল্পাঞ্চল।

বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় এক হাজার সমুদ্রগামী জাহাজ ট্যাংকার, বাল্ক ক্যারিয়ার ও কনটেইনার জাহাজসহ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর প্রায় ৯০ শতাংশই দক্ষিণ এশিয়ায় সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫০ থেকে ২৭০টি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

এ খাত থেকে পাওয়া ইস্পাত দেশের স্টিল রি-রোলিং, নির্মাণ ও জাহাজ নির্মাণসহ বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের ইস্পাতের কাঁচামালের ৬০ শতাংশের বেশি এ খাত থেকে সরবরাহ করা হয় বলেও গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জুনে হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন (এইচকেসি) অনুমোদন করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৫২ শতাংশ ইয়ার্ড সার্টিফাইড অথবা সার্টিফিকেশনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ৩২ জন ইয়ার্ড মালিক ও ব্যবস্থাপকের সাক্ষাৎকারে ১৭টি ইয়ার্ডকে এইচকেসি-সম্মত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে কিছু ইয়ার্ড সাময়িক অনুমোদন পেয়েছে এবং কয়েকটি জাহাজভাঙা সুবিধা পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। একটি ইয়ার্ডকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। সাক্ষাৎকার দেওয়া ৩২ জনের মধ্যে ২৭ জনই মনে করেন, ইয়ার্ড আধুনিকায়নে সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশের উন্নত ইয়ার্ডগুলো যদি গ্যাস পরীক্ষা, নিরাপদ প্রবেশ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রাণহানির ঝুঁকি কমাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের ইয়ার্ডগুলোতে একই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এসব বিষয়ে আরও জোরদারভাবে কাজ করা প্রয়োজন। দেশে আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থাকলেও দুর্ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। তাই ঘাটতি কোথায় ইয়ার্ড মালিকদের দায়িত্বশীলতায়, সরকারি তদারকিতে নাকি আইন প্রয়োগে তা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিপইয়ার্ডের ছাড়পত্র ও তদারকির বিষয়ে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা মূলত শ্রমিকদের অসন্তোষ ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখে থাকি। তবে গুরুত্বপূর্ণ এসব শিল্প ইয়ার্ডে বারবার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে।

সর্বশেষ যে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি তদন্ত করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর কারও গাফিলতি ছিল কি না, থাকলে কার গাফিলতি ছিল এসব বিষয় চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমে আসবে।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসআরবি) মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। তবে নানা কারণে এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং শ্রমিকদের প্রাণহানি হচ্ছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বারবার সামনে আসছে। সর্বশেষ বড় ধরনের একটি ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। আমরা সব ইয়ার্ডের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করব।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। সীতাকুণ্ডের সর্বশেষ প্রাণহানির ঘটনাটি সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে বৈশ্বিক জাহাজভাঙা শিল্প বাজারে বাংলাদেশের বড় অংশীদারত্ব, অন্যদিকে বারবার দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা ঘাটতি এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করেই এখন শিল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। এটি দেশের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাজারে শিল্পটির অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এমআর/আরএফ