রাজধানীতে ডিবি, র্যাব ও পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি ও ছিনতাই করা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গ্রেপ্তারদের মধ্যে চক্রটির প্রধান হিসেবে চিহ্নিত তৈয়ব আলী সর্দারের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি ও দস্যুতাসহ ৪৫টি মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন- পাভেল সর্দার, সাইফুর রহমান, রাব্বি আলম, ইমরান হোসেন ভূঁইয়া, নুরুল ইসলাম ও মো. ইসমাইল।
তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ছয় রাউন্ড গুলি, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ, ভুয়া নম্বর প্লেট, র্যাব ও ডিবি লেখা ভেস্ট, পুলিশের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) মোহাম্মদ ওসমান গণি।
তিনি জানান, গত ১৩ আগস্ট দিবাগত রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, কামরাঙ্গীরচর থানাধীন বেড়িবাঁধসংলগ্ন দূরানী ব্রিজের দক্ষিণ পাশে একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরে এসি লালবাগের নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চালিয়ে তৈয়ব আলী সর্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন ও একটি পকেট রাউটার উদ্ধার করা হয়।

তৈয়বকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান এলাকা থেকে পাভেল সর্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে একটি কিরিচ, দুটি মোবাইল ফোন, র্যাবের লোগোযুক্ত আইডি কার্ড হোল্ডার, দুটি সেনাবাহিনীর ফিল্ড ক্যাপ, কালো লেজার লাইটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
পরে পাভেল ও তৈয়বের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরার সেন্টার পয়েন্ট শপিংমল এলাকা থেকে সাইফুর রহমান, রাব্বি আলম, ইমরান হোসেন ভূঁইয়া, নুরুল ইসলাম ও মো. ইসমাইলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জানান, গ্রেপ্তারদের তথ্যের ভিত্তিতে শপিংমলের পার্কিং এলাকা থেকে একটি কালো ওয়াকিটকি সেট, বাংলাদেশ পুলিশের লোগোযুক্ত হ্যান্ডকাফ, দুটি ভুয়া নম্বর প্লেট, তিনটি র্যাব লেখা ভেস্ট, একটি ডিবি লেখা ভেস্ট, দুটি রিফ্লেক্টিং ভেস্ট, বিভিন্ন রঙের রিফ্লেক্টিং স্টিকার, পিস্তল কভার, একটি খেলনা পিস্তল, তিনটি স্মার্টফোন ও কয়েকটি পকেট রাউটার উদ্ধার করা হয়।
পরে ইমরান হোসেন ভূঁইয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তৈয়বের তথ্য অনুযায়ী ধানমন্ডি এলাকা থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়েছে।
কয়েকটি ডাকাতির ঘটনায় সম্পৃক্ততার তথ্য
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তাররা জিজ্ঞাসাবাদে রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত একাধিক ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে।
এর মধ্যে গত মে মাসে যাত্রাবাড়ী এলাকায় ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনতাই এবং গত জুলাইয়ে খিলক্ষেত এলাকায় একটি কুরিয়ার সার্ভিসের প্রায় ১২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতেও তৈয়ব আলী ও পাভেল সর্দারের নাম এসেছে।
৪৫ মামলার পরও জামিনে বেরিয়ে ফের ডাকাতি
তৈয়ব আলী সর্দারের বিরুদ্ধে ৪৫টি মামলা থাকার তথ্য তুলে ধরে মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, বিভিন্ন সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, আমরা কষ্ট করে সারা দিনরাত পরিশ্রম করে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে দিচ্ছি, কিন্তু তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। জামিনের পর তারা আবার দল গঠন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একইসঙ্গে আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের ফরওয়ার্ডিং, চার্জশিট কিংবা প্রমাণের কোনো দুর্বলতা আছে কি না, সেটিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার।
পকেট রাউটার ব্যবহার করে পুলিশের নজর এড়ানোর চেষ্টা
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, অপরাধীরা নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে পকেট রাউটার ব্যবহার করছে। সাধারণত মোবাইল ফোনের সিম কিংবা ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হলেও পকেট রাউটার ব্যবহার করে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ট্র্যাকিং এড়ানোর চেষ্টা করত।
তবে পকেট রাউটার ব্যবহার করলেও অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে বলে জানান তিনি।
ডাকাতিতে ব্যবহৃত সরঞ্জামের উৎস খুঁজছে ডিএমপি
ডাকাতদের কাছ থেকে র্যাব ও ডিবির ভেস্ট, পুলিশের লোগোযুক্ত সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, এসব সরঞ্জাম তারা কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে এবং কারা এগুলো তৈরি বা সরবরাহ করছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনায় কোনো গডফাদার বা অন্য কোনো চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি গ্রেপ্তারদের ব্যাংক হিসাবও যাচাই করা হচ্ছে।
ওয়াকিটকি বিক্রিতেও নজরদারি
অপরাধীদের কাছ থেকে ওয়াকিটকি উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ওয়াকিটকি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন। অনলাইনে অনুমোদন ছাড়া ওয়াকিটকি বিক্রির বিষয়টিও নজরদারির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, অপরাধীরা ওয়াকিটকি ব্যবহার করলেও তাদের শনাক্ত করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রয়েছে।
গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে কামরাঙ্গীরচর থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির মামলা এবং রূপগঞ্জ থানায় অস্ত্র মামলা করা হয়েছে। এছাড়া যাত্রাবাড়ী ও খিলক্ষেত থানায় দায়ের করা পৃথক মামলাতেও তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া চলছে। পলাতক অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এসএএ/এমএসএ
