নারীদের ভয় দেখিয়ে ঘরে ফেরানো যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
তিনি বলেছেন, নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত থাকবে। নারী হত্যা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার পাশাপাশি এমন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারীকে হত্যা, ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হতে হবে না।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সারাদেশে নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি মহিলা পরিষদের জেলা শাখাগুলোতেও এ কর্মসূচি পালিত হয়।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আমাদের হাতে যে তথ্য-উপাত্ত এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, গত সাত মাসে ৮৩ জন কন্যাশিশু ও ২৫৮ জন নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনা ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন কারণ। কিন্তু এটি শুধু হত্যার সংখ্যা নয়; হত্যার ধরন ও নৃশংসতাও আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যে তথ্য পাচ্ছি, তা মূলত সীমিতসংখ্যক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত। মাত্র ১৪টি পত্রিকার তথ্যের ভিত্তিতে এই চিত্র পাওয়া গেছে। অথচ দেশে আরও অসংখ্য সংবাদমাধ্যম রয়েছে। সব সংবাদমাধ্যমের তথ্য যদি আমাদের হাতে আসত, তাহলে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।’
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মহিলা পরিষদ সভাপতি বলেন, ‘প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশে নারীর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার কতটা নিশ্চিত?’
তিনি বলেন, সমাজে বৈষম্য দূর করতে শুধু বৈষম্য কমেছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না। বৈষম্যের প্রবণতা এবং এর কাঠামোগত কারণগুলোও বিবেচনা করতে হবে। নারীসহ সমাজের সব মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, ‘নারীদের ভয় দেখিয়ে ঘরে ফেরানো যাবে না। নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত থাকবে। নারী হত্যা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকব এবং এমন একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য কাজ করব, যেখানে নারীকে হত্যা, ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হতে হবে না।’
তিনি বলেন, মহিলা পরিষদ শুধু বিচার দাবি করবে না; নারী হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং সামাজিকভাবে সহনশীল পরিবেশ তৈরির জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। নারীর মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
মানববন্ধনে মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬৭ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ সময়ে ২৯২ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা আজ কোনো জায়গাতেই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
তিনি বলেন, শুধু ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতাই নয়, হত্যা, নির্যাতন ও নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সহিংসতার প্রবণতা কমানো যাচ্ছে না। শিশু, কিশোরী, তরুণী কিংবা বৃদ্ধা—কেউই এই সহিংসতার বাইরে নয়।
মালেকা বানু বলেন, একটি নারী বা একটি শিশুর জীবন কোনোভাবেই নগণ্য নয়। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চান, যেখানে নারী ও শিশুরা স্বাধীনভাবে, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে চলাফেরা করতে পারবে। পরিবার হবে নিরাপদ, সমাজ হবে সহনশীল এবং রাষ্ট্র হবে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দাতা।
তিনি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, পরিবার, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও প্রতিটি নাগরিককে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান।
মানববন্ধনে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা বলেন, নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক বৈষম্যমূলক রীতিনীতি নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না। নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ ও আইন বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারির ওপর জোর দেন তারা।
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম, আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি, ঢাকা মহানগর কমিটির লিগ্যাল এইড সম্পাদক শামীমা আফরোজ আইরীন, সাংগঠনিক সম্পাদক কানিজ ফাতেমা টগর ও কেন্দ্রীয় কমিটির লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক অ্যাডভোকেট দীপ্তি শিকদার।
এ ছাড়া সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রোগ্রাম অফিসার সিজুল ইসলাম ও ঢাকা ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার। কর্মসূচিতে মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেত্রী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ প্রায় শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
জেইউ/এমএসএ
