বিজ্ঞাপন

‘১২ বছরেও জলাবদ্ধতা কমে না, এত টাকা খরচ করে লাভ কী?’

‘১২ বছরেও জলাবদ্ধতা কমে না, এত টাকা খরচ করে লাভ কী?’

‘১২ বছর ধরে এই নগরীতে আমি রিকশা চালাই। এই ১২ বছরে দেখতেছি সরকার কাজ করছে, তারপরও জলাবদ্ধতা কমে না। এই টাকা তাহলে খরচ করে লাভ কী?’ 

বৃষ্টির মধ্যে হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে ভেজা রিকশার হ্যান্ডেল ধরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আক্ষেপের কথাগুলো বলছিলেন চালক মো. ইব্রাহিম।

আজ (সোমবার) নগরীর আগ্রাবাদ ও পাঠানটুলী এলাকায় হাঁটুসমান পানি ঠেলে চলতে গিয়ে ইব্রাহিমের মতো একই ক্ষোভ ও চরম ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন নগরীর বাসিন্দা, অফিসগামী মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। 

পাঠানটুলীর বাসিন্দা সাজ্জাদ রাকিব বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নগরীর বাসিন্দাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। সামান্য বৃষ্টি হলেই বাড়ে ভোগান্তি। সারাবছরই উন্নয়নকাজ চললেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বৃষ্টি হলে ভাড়া বেড়ে যায় কয়েক গুণ। একই সঙ্গে নগরীর অধিকাংশ রাস্তাঘাট ভাঙা। এই শহর আস্তে আস্তে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে।’

অফিসগামী রকি হায়দার তার চরম ভোগান্তির কথা জানিয়ে বলেন, ‘দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর যদি এই পরিণতি হয়, তাহলে এ দেশের মানুষ যাবে কোথায়? অফিসে আসতে হলো প্যান্টের বদলে লুঙ্গি পরে। এই ভোগান্তির শেষ কবে হবে, আমাদের জানা নেই।’

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। 

ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, আমাদের অফিসের উদ্দেশ্যে বের হতে হয়। বাসার নিচে পানি, অফিসের নিচে পানি। অন্যদিকে ভাড়া কয়েক গুণ। এত উন্নয়ন করে কী লাভ, যদি কোমরসমান পানি রাস্তায় থাকে?’

রোববার রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বৃষ্টিতে সোমবার সকাল থেকে থমকে গেছে চট্টগ্রাম। নগরীর বহদ্দারহাট, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ ও রাহাত্তারপুলসহ প্রধান প্রধান এলাকাগুলোতে কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে গেছে।

জলাবদ্ধতার এ প্রভাব থেকে রক্ষা পায়নি আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারও। সেখানে পানি জমে উপর থেকে নিচে ঝরনার মতো পানি পড়তে দেখা যায়। 

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। লঘুচাপের প্রভাব ও মৌসুমি বায়ুর কারণে চট্টগ্রামে আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত হতে পারে।

ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।

নগরীর রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা ও কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমেছে।

রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা খাদিজা জান্নাত সুজন বলেন, ‘রাত থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে বের হয়ে দেখি রাস্তায় পানি আরও বেড়েছে। হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষায় একই ভোগান্তি হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।’

বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা ফকরুল আলম বলেন, ‘সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রাস্তায় অনেক পানি পেয়েছি। গাড়িও কম। ফলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে অনেক সময় লাগছে। বৃষ্টির সঙ্গে যানবাহনের সংকট থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।’

বহদ্দারহাট এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী এস এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের বেশি সমস্যা হচ্ছে। অনেকে পানি মাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।’

এদিকে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে নগরীতে গণপরিবহনের সংখ্যাও কম দেখা গেছে। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে নামেনি। ফলে জলাবদ্ধতার সঙ্গে যানবাহন সংকট যুক্ত হয়ে মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।

নগরীর পাশাপাশি আশপাশের উপজেলাগুলোতেও ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর-সাতগড়িয়াপাড়া এলাকায় পুরো বর্ষা জুড়েই জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সড়কে পানি জমে থাকায় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি হচ্ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। এবারও রাতভর বৃষ্টির পর সোমবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন।

এমআর/আরএফ/এনএফ