রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র গ্যাসসংকটে বদলে গেছে রান্নাঘরের স্বাভাবিক চিত্র। দিনের বেশির ভাগ সময় পাইপলাইনে গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ থাকছে না। কোথাও ভোরে, আবার কোথাও গভীর রাতে সামান্য গ্যাস মিললেও তা দিয়ে নিয়মিত রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের আকাশছোঁয়া দামের কারণে সেখানেও স্বস্তি নেই। ফলে বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের দিকে ঝুঁকছেন ঢাকার বাসিন্দারা।
তবে, গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। জেনারেটিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের ঘাটতি থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও সবসময় স্বস্তি মিলছে না নগরবাসীর।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, মিরপুর, পল্লবী, ভাসানটেক, রামপুরা, বনশ্রী, মুগদা, মানিকনগরসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাসসংকটের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সকাল হলেই গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে, আবার কোথাও দিনের পুরো সময়ই চুলা জ্বলছে না। ফলে অনেক পরিবারকে রান্নার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার অনেককে নির্ভর করতে হচ্ছে হোটেলের খাবারের ওপর।
রাজধানীর মুগদা ও মানিকনগর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনভর পাইপলাইনে গ্যাসের দেখা মিলছে না। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবারকে গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত রান্নার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে; তাতেও মিলছে না স্বস্তি। কোনো কোনো এলাকায় টানা কয়েক দিন চুলায় আগুনই জ্বালানো সম্ভব হয়নি। ফলে কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে গৃহিণী— সবাইকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বাসা-বাড়িতে রান্না বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে এলাকার খাবার হোটেলগুলোতে।
রাজধানীতে পাইপলাইনে তীব্র গ্যাসসংকট ও এলপিজি সিলিন্ডারের চড়া দামের কারণে গৃহস্থালির রান্নায় এখন প্রধান বিকল্প হয়ে উঠেছে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকার। দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় কিংবা চুলা না জ্বলায় বাধ্য হয়েই নগরবাসী এসব যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে বড় ইলেকট্রনিক্স মার্কেট থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতেও বৈদ্যুতিক চুলার বেচাকেনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে
মানিকনগর ওয়াসা রোডের বাসিন্দা মরিয়ম-রানা দম্পতি ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে আমাদের এলাকায় গ্যাসের চাপ একদমই কম। অনেক দিন গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকেও রান্না করা যায়নি; ফলে বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছোট দুই ছেলে-মেয়ের জন্য কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও গত সপ্তাহে একটি ইনফ্রারেড বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি। কিন্তু এর ফলে এখন আবার প্রতি মাসে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপ সামলাতে হবে।

দ্রুত বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা
তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে বাজারে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড— এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা তুলনামূলক বেশি। কারণ, ইন্ডাকশন চুলায় বিশেষ কিছু পাত্র ছাড়া সাধারণ হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায় না; অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলায় যেকোনো ধাতব পাত্রেই সহজে রান্না করা সম্ভব।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এসব চুলার পাশাপাশি বিক্রি বেড়েছে রাইস কুকারেরও। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে। মূলত গ্যাসসংকট দেখা দিলে বিক্রিতে গতি আসে; তবে এখন বছরজুড়েই কম-বেশি চাহিদা থাকছে।
গুলিস্তান ন্যাশনাল স্টেডিয়াম মার্কেটের ইলেকট্রনিকস প্রতিষ্ঠান ‘রেডিভিশন’-এর স্বত্বাধিকারী শুক্কুর আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমরা প্রায় ৪০ লাখ টাকার বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি করেছি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব এখনও তৈরি না হলেও বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে ধারণা করছি। এমনকি চলতি বছরের গত দেড় মাসে বেচাকেনা আরও ভালো। সিজনে গ্যাসসংকট বাড়লে বিক্রি হুট করে বেড়ে যায়, তবে এখন বছরের ১২ মাসই কম-বেশি চুলা বিক্রি হচ্ছে।
কারা উৎপাদন করছেন এবং দাম কেমন
দেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্স বা গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক পণ্য প্রস্তুতকারী প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। দেশীয় প্রস্তুতকারকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চুলাও বাজারে ব্যাপকভাবে পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, গাজী, মিয়াকো, কিয়াম, নোভা ও মিজুকি অন্যতম। এছাড়া, বিদেশি ব্র্যান্ডের মধ্যে সিঙ্গার, এলজি, ইলেক্ট্রো মালয়েশিয়া, বাজাজ, ফিলিপস ও নোভিনার বৈদ্যুতিক চুলা বাজারে মিলছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায় বলে ইন্ডাকশন চুলার তুলনায় ইনফ্রারেড চুলার দাম কিছুটা বেশি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিঙ্গেল ইনফ্রারেড চুলা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং ডাবল ইনফ্রারেড চুলা ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, সিঙ্গেল ইন্ডাকশন চুলা সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে, পরিচিত ও নামি ব্র্যান্ডের চুলার দাম অপরিচিত ব্র্যান্ডের চেয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি।

এ প্রসঙ্গে গুলিস্তান ন্যাশনাল স্টেডিয়াম মার্কেটের মেসার্স খান ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সামাদ মির্ধা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ডাবল চুলার চেয়ে সিঙ্গেল চুলার বিক্রি অনেকটাই বেশি। ডাবল চুলা চালানোর জন্য ২২০ থেকে ২৪০ ভোল্টের বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা অনেক বাসা-বাড়ির ওয়্যারিং সিস্টেমে থাকে না। তা ছাড়া ডাবল চুলায় বিদ্যুৎ বিলও বেশি আসে। এসব দিক বিবেচনা করে সাধারণ গ্রাহকেরা সিঙ্গেল চুলাই বেশি কিনছেন। আর মানসম্মত ও পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর চুলার দাম সাধারণ চুলার চেয়ে কিছুটা বেশি।
চাহিদা বেড়েছে রাইস কুকারেরও
রাজধানীতে বৈদ্যুতিক চুলার পাশাপাশি বিক্রি বেড়েছে রাইস কুকারেরও। খোলা আগুনের বা উন্মুক্ত হিটিং কোয়েলের ঝামেলা না থাকায় অনেকে বৈদ্যুতিক চুলার চেয়ে রাইস কুকার ব্যবহারকে তুলনামূলক নিরাপদ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। যদিও এটি দিয়ে সব ধরনের পদ রান্না করা সম্ভব নয়, তবুও জরুরি বিকল্প মাধ্যম হিসেবে রাইস কুকার কেনার দিকেই ঝুঁকছেন নগরবাসীর একটি বড় অংশ।
বাজারে মূলত তিনটি ভিন্ন আকারের রাইস কুকারের চাহিদা ও বিক্রি সবচেয়ে বেশি। ধরন ও ধারণক্ষমতাভেদে এগুলোর দাম ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। চেনা বা প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের তুলনায় নামহীন বা কম পরিচিত ব্র্যান্ডের রাইস কুকার কিছুটা কম দামে মিলছে।
বাসাবাড়িতে ইনফ্রারেড ও ইন্ডাকশন চুলার ব্যবহার বাড়লেও তা গ্রাহকদের জন্য নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করছে। গ্যাসের সংকট এড়াতে কেনা এসব চুলার কারণে পরিবারগুলোর মাসিক খরচে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল। তা ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাসের ঘাটতি থাকায় লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি ডাবল চুলার উচ্চ ওয়াটেজ অনেক বাসাবাড়ির সাধারণ ওয়্যারিঙের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ছে

সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ১.৮ লিটার ধারণক্ষমতার ছোট আকারের (নন-স্টিক) রাইস কুকারগুলো, যেগুলোর দাম বিভিন্ন ব্র্যান্ডভেদে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া ২.৮ লিটার ক্ষমতার মাঝারি রাইস কুকার ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা এবং ৩ লিটার বা তার বড় আকারের মাল্টিফাংশনাল ডিজিটাল মডেলগুলো ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাড়া-মহল্লায়ও বাড়তি বিক্রি, ভোক্তার কাঁধে ব্যয়ের চাপ
বড় বড় ইলেকট্রনিক্স মার্কেটের পাশাপাশি এখন পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতেও বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গৃহস্থালিতে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দেওয়ার পর থেকে মহল্লার ছোট দোকানগুলোতেও এখন সপ্তাহে ৩ থেকে ৪টি চুলা বিক্রি হচ্ছে, যা স্বাভাবিক সময়ে মাসে মাত্র ৪ থেকে ৫টিতে সীমাবদ্ধ থাকত।
মুগদা বাজারের রাজিব হার্ডওয়্যারের বিক্রেতা রোকনউদ্দিন জানান, সাধারণ সময়ে তিনি মাসে ৪-৫টি বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি করতে পারতেন। তবে, গত দেড় মাসে তিনি অন্তত ২০টি চুলা বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কমলেই চুলার চাহিদা বাড়ে। সাধারণত শীতে লাইনে গ্যাসের সমস্যা বেশি দেখা যায়, কিন্তু এবার গ্রীষ্মেও তীব্র সংকট থাকায় কেনাবেচা অনেক বেড়ে গেছে।’
বিকল্প এসব সরঞ্জাম বিক্রি বাড়ায় ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটলেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। একদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত কেনাকাটার খরচ, অন্যদিকে প্রতি মাসের পারিবারিক ব্যয়ে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপ।

খিলগাঁওয়ের চা-বিক্রেতা আসলাম শেখ ঢাকা পোস্টকে জানান, কয়েক মাস ধরে বাসায় ৫ সদস্যের রান্নার জন্য সিঙ্গেল বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন তিনি। এতে প্রতি মাসে তার বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ডাবল বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করলে এই বিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে, ডাবল চুলা চালাতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ওয়াট বিদ্যুতের ক্ষমতার প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ অনেক বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং ও মিটারের জন্য উপযোগী নয়।
এমএমএইচ/এমএআর/
