নিয়ম করেই মাসশেষে আসে গ্যাসের বিল, টাকাও জমা পড়ে ঠিক সময়ে। কিন্তু বিনিময়ে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। রান্নাঘরে চুলা-সংযোগ থাকলেও অধিকাংশ সময় জ্বলে না আগুন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপের দেখা মেলে না। তবে, গভীর রাতে অতিথির মতো অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও তখন ঘুমিয়ে থাকেন অনেকে। বিকল্প না থাকায় কেউ নিরুপায় হয়ে ঘুম বিসর্জন দিয়েই সারেন রান্নাবান্না, কেউবা বাধ্য হয়ে বাড়তি ব্যয়ে কিনে আনছেন বাইরের খাবার। বিল পরিশোধ করে এমন চরম ভোগান্তিতে রাজধানীর বহু পরিবারের নিত্যদিনের রান্না এখন পরিণত হয়েছে দুঃসহ এক যন্ত্রণায়।
মিরপুরের কালশী এলাকার বাসিন্দা জান্নাতুল আক্তার মুন্নী। পাঁচ সদস্যের সংসারে প্রতি মাসের শুরুতেই বাড়িভাড়ার সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৯৯০ টাকা গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হয় তাকে। অথচ দিনের একটি বড় অংশজুড়েই তার রান্নাঘরের চুলা থাকে গ্যাসহীন।
একই হাল গৃহিণী ফিরোজা ইসলামেরও। স্বামী-সন্তান নিয়ে তিনি থাকেন পূর্ব কাফরুলে। ভোর থেকেই তার বাসায় গ্যাসের চাপ কমতে থাকে। নিভু নিভু আগুনে ভাত-তরকারি রান্না করতেই দিনে তিন-চার ঘণ্টা সময় চলে যায়। সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয় সকালের নাশতা তৈরিতে। এতে মাঝেমধ্যেই স্বামীর অফিস কিংবা সন্তানদের স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়।

মুন্নী-ফিরোজাদের বাসার চুলায় নিভু নিভু আগুন জ্বললেও উত্তর বাড্ডার খালপাড় এলাকায় গ্যাসের দেখা মেলে কেবল গভীর রাতে। এখানকার গৃহিণীদের রান্নাবান্না নিয়ে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয়। পেটের ক্ষুধা মেটাতে স্বামী-সন্তান নিয়ে কাটাতে হয় নির্ঘুম রাত। তাদেরই একজন হামিদা খাতুন। রাত ২টা বাজলেই তার ঘরে শুরু হয় রান্নার ব্যস্ততা, যা শেষ করতে করতে গড়ায় ভোর। সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য না থাকায় কোনো কোনো দিন না খেয়েই কাটাতে হয় পরিবারটিকে।
রাজধানীতে গ্যাসের নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও গৃহস্থালির পাইপলাইনে চাহিদামতো চাপ পাচ্ছেন না বৈধ গ্রাহকেরা। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা গ্যাসহীন থাকায় কিংবা নিভু নিভু জ্বলতে থাকায় রান্না সারতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। ফলে বিকল্প হিসেবে বাইরে থেকে খাবার কেনা ও বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহারে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসে অতিরিক্ত ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে
বাসাবাড়ি বদলানোর কাজ করেন হামিদার স্বামী, আর ছেলেও বাবার কাজে সহায়তা করেন। দুজনের আয়ে চলে চারজনের সংসার। চলতি মাসে উত্তর বাড্ডার খালপাড় এলাকায় একটি টিনশেড বাড়িতে ওঠেন তারা। বাসা নেওয়ার সময় গ্যাস সংযোগসহ ভাড়ার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত দিনের বেলায় গ্যাসের চুলায় আগুন জ্বলতে দেখেননি হামিদা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তর বাড্ডার সুতিভোলা খালঘেঁষে উঁচুতলা ভবনের মাঝে টিনশেড বাড়টিতে হামিদা-রেজিয়াসহ ১৬টি পরিবারের বসবাস। সবার জন্য রয়েছে যৌথ আটটি চুলা। কিন্তু সকাল ১০টার পর পুরো রান্নাঘর নিস্তব্ধ। গ্যাসের চুলার ঠিক নিচেই রয়েছে লাকড়ি ব্যবহারের মাটির চুলা। গ্যাসসংকটে এটিই এখন তাদের মূল ভরসা।
গত ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় হামিদা খাতুনের। তখনও সকালের খাবার জোটেনি তার মুখে। কারণ, ভোর পর্যন্ত জেগে রান্না সেরে ঘুমাতে যাওয়ায় সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে।
হামিদা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘স্বামী, ছেলে ও শাশুড়িকে নিয়ে আমাদের চারজনের সংসার। আমাদের এখানে দিনভর গ্যাসের দেখা মেলে না; প্রায় দিনই রাত ২টার পর এসে ভোর ৫টার দিকে চলে যায়। তাই বাধ্য হয়ে রাত জেগেই রান্না সারতে হয়। কোনো দিন রান্না না করতে পারলে না খেয়েই কাটাতে হয়। আশপাশের অনেকে গ্যাস সিলিন্ডার কিনলেও আর্থিক অনটনের কারণে লাইনের গ্যাসের জন্যই আমাদের চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজও রান্নাবান্না শেষ করে খাওয়া-দাওয়া সারতেই ভোর চারটা বেজে গেছে। এরপর ঘুমাতে যাওয়ায় সকালে উঠতে দেরি হয়। দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের এভাবে চলছে। আয়-রোজগারও নিয়মিত নয়; স্বামী-ছেলের মাসে অল্প কিছু কাজ আসে, তা দিয়েই সংসার চালাতে হয়। তাই সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য না থাকায় গ্যাস এলেই রাতে রান্না করি।’
একই বাড়িতে চার মাস ধরে থেকে একই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন হামিদার প্রতিবেশী রেজিয়া বানু। তার স্বামী একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী; এক হাতের অর্ধেক না থাকায় আগে ব্যবসা করলেও এখন অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। প্রতিবেদককে দেখে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে সংযোগ থাকা সত্ত্বেও চুলা ধরানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালান এই গৃহিণী।
তীব্র গ্যাসসংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষেরা। সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক পরিবারকে গভীর রাতে জেগে রান্নাবান্না করতে হচ্ছে, আবার কেউ ভরসা করছেন লাকড়ির মাটির চুলায়। সেবা না দিয়ে মাসশেষে বিল আদায়কে ‘জ্বালানি অবিচার’ হিসেবে অভিহিত করে ভুক্তভোগী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত এগিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা
তবে, গ্যাসের আশায় আর রাত জাগেন না রেজিয়া। কারণ, রাত আড়াইটার দিকে গ্যাস এলে তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং ফজরের নামাজ পড়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া কোনো কোনো রাতে ওই সময়ও গ্যাস আসে না। তাই গ্যাসের ওপর ভরসা না রেখে কখনও সিলিন্ডারে আবার কখনও লাকড়ির চুলায় একবেলা রান্না করেন। আর তা সম্ভব না হলে দোকান থেকে খাবার কিনে এনে খান।
রেজিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমি তো গ্যাস পাই-ই না। গভীর রাতে গ্যাস এলে কি ঘুম নষ্ট করে ফজরের নামাজ বাদ দেব? সেটা তো সম্ভব নয়। তাই যখন পারি সিলিন্ডার বা লাকড়ি দিয়ে একবেলা রেঁধে নিই, আর না পারলে হোটেল থেকে কিনে খাই।’
এদিকে মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ে গৃহিণী ফিরোজা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ভোর থেকেই লাইনের গ্যাসের চাপ কমতে থাকে। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয় না, নিভু নিভু আগুনে রান্না সারতে হয়। আগে যেখানে এক ঘণ্টা লাগত, এখন সেখানে তিন-চার ঘণ্টা চলে যায়। এর ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় সকালের নাশতা বানাতে গিয়ে; যার কারণে বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হয় এবং স্বামীর অফিসে যেতেও বিলম্ব ঘটে।’
নিয়মিতই গ্যাসের বিল পরিশোধ করছেন মিরপুরের পাইকপাড়ার বাসিন্দা হিমেল। একটি বেসরকারি আইটি সংস্থায় কর্মরত এই তরুণ জানান, কয়েক মাস ধরে তার পরিবার তীব্র গ্যাসসংকটে ভুগছে। তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ভোরে অল্প কিছুটা থাকলেও সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পুরোপুরি গ্যাসহীন থাকে পুরো এলাকা। সন্ধ্যার পর অল্প সময়ের জন্য গ্যাসের দেখা মিললেও রাত ৮টা বাজতেই তা আবার মিলিয়ে যায়।

হিমেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সকালে শুধু ভাত রান্না করতেই ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যায়। মাছ বা মাংসের মতো খাবার তো ঠিকমতো সেদ্ধই হতে চায় না। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পরিবারের নারীরা এই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। আমরা নিয়মিত বাড়িভাড়ার সঙ্গে গ্যাসের বিল দিয়ে আসি, তাই সব সময় বাড়তি টাকা খরচ করে সিলিন্ডার ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে বাসায় রান্না না হলে অগত্যা হোটেলের খাবারের ওপরই নির্ভর করতে হয়। একপ্রকার ইলেকট্রিক চুলা আর বাইরের খাবারের ওপর ভরসা করেই দিন পার করছি।’
নিজের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘বাইরের খাবার খাওয়া আর ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহারের কারণে প্রতি মাসে আমার প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, যা বহন করা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। নিয়মিত ৯৯০ টাকা সরকারি বিল পরিশোধ করেও যদি গ্যাস না পাই, তবে এই কষ্টের কথা কার কাছে বলব? সকালে গ্যাস থাকলে অফিসে দুপুরের খাবার বাসা থেকেই আনা যেত; কিন্তু বাধ্য হয়ে হোটেলের ঝুঁকিপূর্ণ খাবার বেশি দামে কিনে খেতে হচ্ছে।’
কেন এই সংকট?
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হওয়া তীব্র গ্যাসসংকটের পেছনে মূল কারণ চাহিদার তুলনায় চরম সরবরাহ ঘাটতি— এমনটাই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বৈধ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত বিল আদায় করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না দেওয়া ভোক্তাদের মৌলিক অধিকার হরণ ও জ্বালানি সুবিচার থেকে বঞ্চিত করার নামান্তর।
এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সেবা না দিয়ে বৈধ গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়মিত বিল নেওয়া চরম অন্যায় ও অবিচার। সেবা নিশ্চিত না করে অর্থ আদায় করার কোনো সুযোগ নেই; এতে সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য জ্বালানি সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
সামাজিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারগুলো এখন আর পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয়; তারা বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহারের সামর্থ্য রাখে। কিন্তু প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত মানুষের সেই সুযোগ নেই। তাদের দিনে একটুখানি গ্যাসের অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে থাকতে হয়। এই ভুক্তভোগীদের মধ্যে অনেক কর্মজীবী নারী রয়েছেন— যারা পোশাক কারখানায় কাজ করেন, গৃহপরিচারিকার কাজ করেন কিংবা স্বল্প বেতনের চাকরি করেন। তাদের পরিবার সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বিকল্প জ্বালানি কিনতে পারে না। তাই প্রান্তিক এসব মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকেই দ্রুত দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
এমআরআর/এমএআর/
