সকাল ১০টা বাজতেই রাজধানীর বনশ্রীতে অবস্থিত ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) কার্যালয়ে হাজির সত্তোরোর্ধ্ব আজহারুল হক। ঠিকমতো হাঁটতে পারছেন না, বয়সের কারণে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে তার। হাতে বিদ্যুৎ বিলের কাগজ নিয়ে গ্রাহকসেবা কক্ষে প্রবেশ করলে প্রিপেইড মিটারের বিষয় হওয়ায় সেখান থেকে তাকে অন্য একটি কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে কার্যালয়ের কো-অর্ডিনেটর হাসানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
চোখেমুখে ক্লান্তি ও ক্ষোভ নিয়ে নিজের অভিযোগের কথা জানাতে থাকেন আজহারুল হক। বিলের কাগজটি কর্মকর্তার হাতে তুলে দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে আমার বিদ্যুৎ বিল আসত ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু এ মাসে বিল এসেছে ৭ হাজার ২৯৮ টাকা!’
কাগজটি হাতে নিয়ে কর্মকর্তা হাসানও চিন্তায় পড়ে যান— কীভাবে বিল এতটা বেশি এলো! শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে সরেজমিনে মিটারটি পরীক্ষা করার জন্য আজহারুল হকের সঙ্গে কার্যালয়ের এক লাইনম্যানকে পাঠান তিনি।
রাজধানীতে প্রিপেইড মিটারে ভূতুড়ে বিলের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ডিপিডিসির গ্রাহকেরা। স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়তি বিল আসায় বনশ্রী ও মালিবাগ কার্যালয়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। নেটওয়ার্কজনিত ত্রুটি, পূর্বসমীক্ষা ছাড়া প্রিপেইড চালুর সিদ্ধান্ত এবং বিদ্যুতের ইউনিট ব্যবহারের উচ্চমূল্যকে এই অতিরিক্ত খরচের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
আজহারুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কখনোই আমার বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার ২০০ টাকার বেশি আসেনি। অথচ গত মাস ও চলতি মাসে বিল তিন গুণেরও বেশি এসেছে। আগে যে কয়টি যন্ত্র চালাতাম, এখনো তা-ই চালাই। এত টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, বুঝতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে এই বয়সে অফিসে ছুটে এসেছি।’

ঠিক একই অভিযোগ নিয়ে বেলা ১১টার দিকে ওই কার্যালয়ে আসেন হাবিবা বেগম। তার ভাষ্য, তিনটি লাইট, দুটি ফ্যান ও একটি ফ্রিজ ব্যবহার করায় আগে প্রতি মাসে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা বিল আসত। কিন্তু এ মাসে সেই বিল লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৪৭ টাকায়! প্রায় চার গুণ বেশি বিল আসায় কার্যালয়ে এসে কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। পরে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে তিনি প্রস্থান করেন।
বিরক্তির সুরে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘যেখানে প্রতি মাসে বিল আসত ২ হাজার টাকার নিচে, সেখানে এ মাসে এসেছে প্রায় ৬ হাজার টাকা! কীভাবে এত বিল আসে, মাথায় ধরে না। গত মাসেও বিল বেশি আসায় পরিশোধ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এবার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মিটার চেক করার জন্য আবেদন করতে বলেছে, আবেদন করেছি।’
ভূতুড়ে বিলের বিষয়ে ডিপিডিসির কো-অর্ডিনেটর হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের অফিসে ৬০ থেকে ৭০ জন গ্রাহক অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নিয়ে আসছেন, যার প্রতিটিই প্রিপেইড মিটারসংক্রান্ত। প্রতিদিন একই অভিযোগ সামলাতে গিয়ে আমরাও অতিষ্ঠ। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কোনো সমাধান মেলেনি।’
প্রিপেইড মিটার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ধরনের মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা বা প্রস্তুতি ছাড়াই বিগত সরকার (আওয়ামী লীগ সরকার) এটি চালু করেছে। এই মিটারে নেটওয়ার্ক একটি বড় উপাদান। সিংহভাগ সময় নেটওয়ার্কজনিত ত্রুটির কারণেই গ্রাহকেরা নানান ভোগান্তিতে পড়েন। অথচ পোস্টপেইড মিটারে এমন জটিলতা ছিল না।’
ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের চাপ সামলাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও বয়স্ক গ্রাহকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বহু চেষ্টার পরও ডিপিডিসির স্থানীয় অফিস থেকে কোনো সমাধান না পেয়ে প্রিপেইড মিটারকে এখন ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন ভুক্তভোগীরা। বিদ্যমান এই সংকট উৎরাতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান এই জটিলতা বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) আমলের অব্যবস্থাপনার ফসল
অতিরিক্ত বিল আসার কারিগরি কারণ ব্যাখ্যা করে এই কর্মকর্তা জানান, সরকার সম্প্রতি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ব্যবহারের ধাপ অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্য ভিন্ন হয়। যেমন— আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রথম ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা; ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ৮ টাকা ৫০ পয়সা; ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ৯ টাকা ১০ পয়সা; ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ৯ টাকা ৬২ পয়সা; ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। বর্তমান সময়ে যেকোনো বাসায় একটি এসি ও ফ্রিজ চললেই ব্যবহার ৪০০ ইউনিট ছাড়িয়ে যায়, যে কারণে বিল দ্রুত বেড়ে যায়।

একই চিত্র দেখা যায় ডিপিডিসির মালিবাগ কার্যালয়েও। সেখানে প্রতিদিন অতিরিক্ত বিলের নালিশ নিয়ে গ্রাহকদের ভিড় জমছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেখানকার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিনিয়ত গ্রাহকেরা বাড়তি বিলের অভিযোগ নিয়ে আসছেন। আমরা সাধ্যমতো পরামর্শ দিচ্ছি এবং প্রতিটি সমন্বয় সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রিপেইড মিটারের জটিলতা জানাচ্ছি। কিন্তু ওপরমহল থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’
এদিকে, সম্প্রতি রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কথা তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে আমরা একধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অস্বীকার করার উপায় নেই, এটি বিগত সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যা। দুর্ভাগ্যবশত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়; এর জন্য অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। আমরা এই পরিস্থিতি উত্তরণে কাজ করে যাচ্ছি।’
এমএল/আরএফ/এমএআর/
