টিনশেড বাড়ির ঠিক সামনেই কিছু পুরোনো বাঁশের চটি। সরু গলির প্রবেশমুখে মরিচা ধরা দুটি চুলা, সঙ্গে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগও স্পষ্ট। কিন্তু লাইটার কিংবা ম্যাচের কাঠি জ্বালালেও আগুনে ওঠে না একটুও শিখা। তাই ষাটোর্ধ্ব জুলেখা বেগমের একমাত্র ভরসা এখন মাটির উনুন আর কুড়িয়ে আনা খড়কুটো। স্বামী দারোয়ান এবং ছেলে গাড়িচালক; দুজনের আয়ে চলে পাঁচজনের সংসার। ফলে গ্যাসের সংকট তাদের কাছে কেবল রান্নাঘরের ভোগান্তি নয়, বরং প্রতিদিনের খাবার জোগাড়েরও এক দুঃসহ লড়াই। চুলায় আগুন না জ্বললে কখনও স্বামী-ছেলেকে সকালেই না খেয়ে কাজে বের হতে হয়, আবার কখনও পুরো পরিবারের একবেলা খাবার জোটে সামান্য শুকনো মুড়িতে।
জুলেখারা থাকেন রাজধানীর উত্তর বাড্ডার খালপাড় লাগোয়া একটি টিনশেড বাসায়। বাসাভাড়ার সঙ্গে নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করলেও দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গ্যাসসংকটে ভুগছেন এখানকার সব ভাড়াটিয়া। তাই প্রায় প্রতিদিনই মাটির চুলা জ্বালানোর জন্য আশপাশ থেকে কাঠ, বাঁশের চটি আর শুকনা পাতা কুড়িয়ে আনতে হয় তাকে। কেবল জুলেখা নন, এই বাড়ির প্রায় সব পরিবারই এখন পাইপলাইনের গ্যাসের চেয়ে মাটির উনুনের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।
জুলেখা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মাটির চুলায় আগুন জ্বালানোর জন্য প্রতিদিন এভাবে জ্বালানি কুড়াতে হয়। বাসায় গ্যাসের সংযোগ থাকলেও দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। চুলায় আগুন না ধরলে রান্নাও বন্ধ থাকে, আর বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্য তো আমাদের নেই।’

আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, ‘ফজরের নামাজ পইড়া চুলার কাছে গেলে গ্যাস থাকে না। দোকান থাইক্কা আইন্না কত খাইতে পারে? তার জন্য আমরা লাকড়ি টুকাইয়া আইন্না মাটির চুলায় জ্বালাই আর রান্ধি। আমরা গরিব মানুষ, খাইট্যা খাওরি। সিলিন্ডার কিনবার এত আয় কইত্থে করমু। চুলায় আগুন না ধরলে না খাইয়া থাকতে হয়। দোকানে যাইয়া খাবার আনতে গেলে দামও রাহে বেশি। যেদিন টোটাল গ্যাস থাকে না, তখন অন্য কিছুও কেনন যায় না। সে সময় আমরা সাধারণ পরিবাররা মুড়ি-টুড়ি কোনো কিছু আইন্না খাই।’
গ্যাসের চরম অনিশ্চয়তার কারণে এই বয়সেও একসঙ্গে বেশি রান্না করে রাখার সুযোগ নেই বৃদ্ধার। পুরোনো একটি ফ্রিজে সামান্য রান্না করা খাবার দু-একদিন রাখা গেলেও তা গরম করার জন্যও তো আগুনের প্রয়োজন! জুলেখার ভাষায়, ‘ফ্রিজে থুইলেও তো আগুন লাগব, গরম কইরা তো খাইতে হইব। ফ্রিজের জিনিসটা এইভাবে খাওন যায় না।’
গ্যাসের এই ভোগান্তি শুধু খাবারেই সীমাবদ্ধ নেই; সন্তানের স্কুলের টিফিন ও লেখাপড়াতেও ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব।

জুলেখা বেগমের প্রতিবেশী রুমানা আক্তার। স্বামী গ্রিল ওয়ার্কশপে কাজ করেন এবং দুই সন্তান স্কুল ও মাদরাসায় পড়ে। এই বাড়িতে ২৭টি পরিবারের বসবাস হলেও যৌথ চুলা রয়েছে মাত্র ১৬টি। তবে, ভোর ৫টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকে না বললেই চলে। গভীর রাতে কেবল কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস এলে শুরু হয় রান্নার যুদ্ধ।
রুমানা জানান, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই ভোগান্তি চলছে। ভোরে রান্না করা খাবার অনেক সময় রাত পর্যন্ত রাখতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। গ্যাস না থাকায় বাচ্চাদের সকালের টিফিন দেওয়া যায় না; ফলে হোটেল থেকে পরোটা-পুরি কিনে দিতে হয়, যা তাদের সীমিত আয়ে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
গত ১৬ আগস্ট ভোর ৩টায় উঠে রান্না করতে হয়েছে রুমানাকে। ভাত, ডাল ও তরকারি রান্না শেষ করতে করতে পার হয়ে যায় ভোর ৫টা। তবে, রুমানার দাবি খুব বড় নয়— অন্তত বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক চাপের গ্যাস চান তিনি, যেন সন্তানদের সময়মতো রান্না করে দিতে পারেন এবং ঠান্ডা খাবার খেয়ে শিশুরা অসুস্থ হয়ে না পড়ে।

পূর্বের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে রুমানা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আগে শীতে কিছুটা সমস্যা হতো, কিন্তু এখন ভরা গরমেও এই হাল। এক কক্ষের ভাড়া বাসায় সন্তানদের নিয়ে থাকি, তাই বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতেও ভয় পাই। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ— বাসাবাড়িতে যেন অন্তত রান্নার সময়টুকুতে সঠিকভাবে গ্যাস দেওয়া হয়।’
আট পরিবারের জন্য চারটি চুলা থাকা পাশের আরেকটি বাড়ির বাসিন্দা ফাতেমা আক্তার মুক্তা। গ্যাসের অপেক্ষায় প্রায়ই রাত জাগতে হয় তাকে। রাত ১টা বা ২টার দিকে গ্যাস এলে শুরু করেন রান্না। চাপ কম থাকলে সে রান্না শেষ হতে ভোর ৪টা বেজে যায়। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমিয়ে সকাল ৬টায় সন্তানকে নিয়ে স্কুলের উদ্দেশে বের হতে হয় তাকে।
ফাতেমা জানান, গ্যাস না এলে যৌথভাবে লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হয়। সেখানেও চার পরিবারকে লাইন ধরে অপেক্ষা করতে হয়। ইলেকট্রিক চুলা বা সিলিন্ডার কেনার আর্থিক সামর্থ্য তার নেই। তিনি বলেন, ‘ভোর ৪টায় ঘুমিয়ে আবার ৬টায় উঠে বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। আর্থিক অবস্থা ভালো হলে সিলিন্ডার বা কারেন্টের চুলা কিনতাম, রাত জেগে এভাবে কষ্ট করতে হতো না।’

চুলায় নিয়মিত গ্যাস না মিললেও বাসাভাড়ার সঙ্গে ঠিকই আদায় করা হচ্ছে বিল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্যাসের কথা বলেই রুমভাড়ার একটি অংশ কেটে রাখা হয়, অথচ পুরো মাসজুড়ে চুলার দেখা পাওয়া মুশকিল।
আব্বাস উদ্দিন নামের এক ভাড়াটিয়া জানান, গ্যাস সংযোগের নাম করেই বাড়িওয়ালারা রুমভাড়ার সঙ্গে নিয়মিত টাকা আদায় করছেন, কিন্তু দিনের সিংহভাগ সময়ই চুলায় কোনো আগুন থাকে না।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট নিরসনে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি-খনিজ সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম।

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দেশে সংকট তৈরি হচ্ছে। আর জাতীয় সরবরাহ কম থাকলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত অগ্রাধিকার পাওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়। সরকার বাধ্য হয়েই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পকারখানায় আগে সরবরাহ করে, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ বাসাবাড়ির গ্রাহকদের।’
সংকট নিরসনে টেকসই সমাধানের পথ বাতলে দিয়ে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘দিন দিন গ্যাসের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানি বাড়ানোর চেয়ে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি করাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা। বাংলাদেশ একটি গ্যাসপ্রবণ অঞ্চল এবং আমাদের মাটির নিচে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিদেশি এলএনজি আমদানির ওপর না ঝুঁকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।’
এমআরআর/জেআই/এমএআর/
