বিজ্ঞাপন

গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের ধকল, ব্যাহত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা

গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের ধকল, ব্যাহত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা

রাজধানী ঢাকার পাশের গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী গ্রামের বাসিন্দা ছোয়াইদ হাসান নুজাইম। স্থানীয় বরমী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর কাছে দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকাটা এখন আর নতুন কিছু নয়। কারণ, বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন আবার আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই পড়ার টেবিলে বসার সময় যেমন বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকতে হয়, তেমনি স্কুলের শ্রেণিকক্ষেও অপেক্ষা করতে হয় একটু স্বস্তির বাতাসের।

ছোট নুজাইমের অভিযোগ, দিন-রাতের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। যার কারণে বাসায় ঠিকমতো পড়তে পারি না। আবার স্কুলেও অনেক গরম লাগে। ফ্যান বন্ধ থাকলে ঘেমে যাই, পড়ায়ও মনোযোগ থাকে না।

এই অভিজ্ঞতা শুধু নুজাইমের একার নয়। বরমী ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন প্রায় একই চিত্র। দিনের তীব্র গরমে শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর ফ্যান থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তা অচল। গরম নিবারণে কেউ খাতা দিয়ে বাতাস করে, কেউ বারবার পানি পান করে, আবার কেউ অস্থির চোখে তাকিয়ে আছে বন্ধ ফ্যানের দিকে। এতে করে শিক্ষক পাঠদান চালিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আটকে থাকে গরম আর বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায়। তাতে বিদ্যুতের মতো পড়াশোনাও রুটিনের বাইরে চলে যাচ্ছে।

শুধু দিনের ক্লাসেই নয়, রাতের লোডশেডিংও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় তৈরি করছে নতুন সংকট। স্থানীয় আরেকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ জানায়, রাতে পড়তে বসার সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়। বাড়িতে বিকল্প আলোর ব্যবস্থা থাকলেও তীব্র গরমে দীর্ঘসময় বই নিয়ে বসে থাকা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয় ঘুমের ব্যাঘাত। ফলে পরদিন সকালে স্কুলে এসে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত লাগে।

আহাদ বলে, রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে ঘুমাতে কষ্ট হয়। পড়তেও পারি না। সকালে স্কুলে গেলে ঘুম ঘুম লাগে। ক্লাসে মনোযোগ দিতে তখন আরও কষ্ট হয়।

নুজাইম ও আহাদের এই অভিজ্ঞতা দেশের বিভিন্ন মফস্বল এবং গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থীর বর্তমান বাস্তবতা। দিনের বেলায় লোডশেডিংয়ে শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, আর রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় নষ্ট হচ্ছে পড়াশোনা ও ঘুমের সময়। স্কুলের ক্লাস, বাড়ির কাজ, পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা পরদিনের পড়া সবকিছুতেই তৈরি হচ্ছে ছন্দপতন। বিদ্যুৎ কখন থাকবে আর কখন থাকবে না তার অনিশ্চয়তায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনার একটি নির্দিষ্ট রুটিনও ধরে রাখতে পারছে না।

এই দুর্ভোগের কারণ খুঁজতে মিলেছে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র। চলতি বছরের শেষ শ্রাবণে এসে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ আগস্টের দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালের একই দিনের তুলনায় দুই বছরের ব্যবধানে এই পরিমাণ প্রায় ১৮ গুণ বেশি। আর ২০২২ সালের ৫৫ মেগাওয়াটের সঙ্গে তুলনা করলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে লোডশেডিং বেড়েছে প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ গুণ।

পিডিবি সারা দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা বিবেচনায় একটি গড় লোডশেডিংয়ের হিসাব দেয়। অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, চাহিদা ও ঘাটতির তথ্য প্রকাশ করে। পিজিসিবির তথ্যেও নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির বড় চিত্র উঠে এসেছে। গত ১০ আগস্ট রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।

dhakapost

চলতি ১৬ আগস্টের বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাসেও ঘাটতির আশঙ্কা স্পষ্ট। পিজিসিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এদিন দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ১৫ আগস্ট প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৯১ মেগাওয়াট, বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৯০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার এই ব্যবধানের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। তীব্র গরমের মধ্যে দিনের পর দিন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা। কারণ বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু ঘরের ফ্যানই বন্ধ থাকে না, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষেও থাকে না স্বাভাবিক অবস্থা। ফ্যানের বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।

শিক্ষার্থীরা বলছে, দিনের বেলায় লোডশেডিং হলে ক্লাসে বসে থাকাই কষ্টকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে শরীর দুর্বল হয়ে আসে। তখন শিক্ষক কী পড়াচ্ছেন, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে অনেকের মনোযোগ চলে যায় কখন বিদ্যুৎ আসবে কিংবা কখন একটু বাতাস পাওয়া যাবে সেদিকে। ফলে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও তারা কতটা পাঠ আত্মস্থ করতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষকদেরও একই অভিজ্ঞতা। তারা বলছেন, গরমের মধ্যে ফ্যান বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক অস্বস্তির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। এতে স্বাভাবিক পাঠদানও প্রায় ব্যাহত হয়।

স্থানীয় মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই তীব্র গরম। এর মধ্যে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে ক্লাসে মনোযোগী রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। ফ্যান বন্ধ থাকায় তারা ঘেমে যায়, অস্বস্তি বোধ করে। আমরা পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু শিক্ষার্থীদের মনোযোগের বড় একটি অংশ তখন গরম ও বিদ্যুৎ আসার দিকে থাকে। বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি প্রকট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বলেন, দিনের বেলায় লোডশেডিংয়ের কারণে ক্লাসে মনোযোগ কমার পাশাপাশি রাতের বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলছে। অনেক শিক্ষার্থী রাতে পড়তে পারে না, আবার গরমে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না। ফলে পরদিন স্কুলে এসে তারা ক্লান্ত থাকে এবং পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না। এভাবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ও ফলাফলেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির উপর প্রভাব ফেলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এমন অবস্থায় অভিভাবকরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। তারা বলছেন, সন্তানকে পড়তে বসালেও বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করতে পারছে না। রাতে ঘুমাতে না পারায় সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় ক্লান্ত থাকে।  

লোডশেডিং শুধু শিক্ষার্থীদের বর্তমান পড়াশোনাকেই ব্যাহত করছে না, তাদের নিয়মিত জীবনযাপন ও পড়ার অভ্যাসেও প্রভাব ফেলছে।

এনামুল হাসান নামের এক অভিভাবক বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তারও কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। ফলে সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছি। রাতে পড়তে পারে না, গরমে ঘুমাতেও পারে না।

তিনি আরও বলেন, এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে বিদ্যুৎ এলেও স্বস্তি নেই। কখন চলে যাবে সেই চিন্তা থাকে। আইপিএস থাকলেও ঠিকমতো চার্জ দেওয়ার সময় পাওয়া যায় না। সন্তানরা পড়তে বসলে বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার রাতে ঘুমের সময়ও একই অবস্থা। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেই হবে, বিকল্প নেই : অধ্যাপক শামসুল আলম

দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির সমাধানে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। দেশে যে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, সেটি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর উৎপাদন বাড়াতে হলে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার যে ভর্তুকি দিচ্ছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, যাদের সামর্থ্য আছে, তারা ক্যাপটিভ বা ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারেন। গুলশান, ধানমন্ডি, বারিধারার মতো এলাকার অনেকেই এ ধরনের ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রামে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের সেই সামর্থ্য নেই। তাদের জন্য বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজনীয় সেবা। তাই তাদের চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরএইচটি/জেডএস